ভেবে দেখুন তো, রাতে ঘুমাতে গেলেন ৪ অক্টোবর, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্যালেন্ডারে দেখলেন আজ ১৫ অক্টোবর! ঘড়ি ঠিক চলছে, বাড়ির চারপাশ একই আছে, কিন্তু ক্যালেন্ডার থেকে হুট করে গায়েব হয়ে গেছে পুরো ১০টি দিন। কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয় নয়, কিংবা এলিয়েনদের হামলাও নয় বাস্তব ইতিহাসেই এমন এক অদ্ভুত এবং অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছিল।
হুট করে জীবন থেকে ১০টি দিন হারিয়ে যাওয়ার এই রূপকথার মতো রহস্যময় অধ্যায়টির নাম ‘ক্যালেন্ডার লিপ’।
যখন হারিয়ে গেল জীবনের ১০ দিন
১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার। ইউরোপের সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের মতো রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুতে গিয়েছিল। সন্তানরা সকালে ঘুম থেকে উঠে নতুন দিনে খেলার পরিকল্পনা করছিল, ব্যবসায়ীরা ভাবছিলেন পরদিনের হিসাব নিয়ে। কিন্তু পরদিন শুক্রবার সকালে ঘুম ভাঙতেই পুরো ইউরোপজুড়ে নেমে আসে এক অদ্ভূত স্তব্ধতা।
লোকেরা খবরের কাগজ আর সরকারি আদেশ দেখে চোখ কপালে তুলল। সেদিন ৫ অক্টোবর হওয়ার কথা থাকলেও পোপের আদেশে রাতারাতি তারিখ হয়ে গেছে ১৫ অক্টোবর! জীবনের ১০টি দিন এক রাতের ঘুমেই বাষ্প হয়ে গেল। ৫ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত জন্ম নেওয়া শিশুরা ইতিহাসের পাতায় তাদের জন্মতারিখই হারিয়ে ফেলল!
কেন এই সময়ের গোলকধাঁধা?
হঠাৎ করে ক্যালেন্ডার থেকে ১০টি দিন কেন মুছে ফেলা হলো? এর পেছনে লুকিয়ে ছিল একটি বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক রহস্য।
তখন পুরো বিশ্ব চলত সম্রাট জুলিয়াস সিজারের তৈরি ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী। জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ধরে নিয়েছিল যে, এক বছর হতে সময় লাগে ঠিক ৩৬৫ দিন ও ৬ ঘণ্টা। কিন্তু প্রকৃতি তো মানুষের বানানো নিখুঁত নিয়মে চলে না! প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে ৩৬৫ দিন, ৫ ঘণ্টা, ৪৮ মিনিট এবং ৪৬ সেকেন্ড।
অর্থাৎ, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রকৃতির চেয়ে প্রতি বছর মাত্র ১১ মিনিট বেশি হিসাব করছিল। আপাতদৃষ্টিতে এই ১১ মিনিটকে খুব সামান্য মনে হলেও, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমা হতে হতে ১৫৮২ সাল নাগাদ এই পার্থক্য দাঁড়িয়েছিল পুরো ১০ দিনে! প্রকৃতি আর মানুষের ক্যালেন্ডারের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল গোলকধাঁধা।
ইস্টার ও পোপের মহা উদ্বেগ
ক্যালেন্ডার ভুল দিকে দৌড়াচ্ছে, এতে সাধারণ মানুষের খুব একটা খেয়াল ছিল না। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল চার্চের হিসাব-নিকাশে।
খ্রিস্টধর্মের অন্যতম প্রধান উৎসব ‘ইস্টার’ পালনের নিয়ম হলো বসন্তের পূর্ণিমার পর। কিন্তু সময়ের এই ১১ মিনিটের হেরফেরের কারণে বসন্তকালই ক্যালেন্ডারে পিছিয়ে যাচ্ছিল। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, আর কয়েক শতাব্দী পর হয়তো দেখা যেত কনকনে শীতের বরফের মধ্যে মানুষ বসন্তকালের উৎসব পালন করছে!
এই গোলকধাঁধা মেলাতে এগিয়ে এলেন ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদদের তলব করলেন। সমাধান একটাই! ভুল সংশোধন করতে হলে জমে থাকা ১০ দিনের বাড়তি বোঝা এক ঝটকায় কেটে বাদ দিতে হবে!
গুজব, আতঙ্ক ও বিদ্রোহের কালো ছায়া
পোপের এই আদেশ ঘোষণা করার পর ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তুমুল আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা। সাধারণ মানুষ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বুঝতে নারাজ; তারা ভেবেছিল চার্চ হয়তো তাদের আয়ু থেকে ১০ দিন চুরি করে নিয়েছে!
দিনমজুর ও শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, ‘আমাদের ১০ দিনের বেতন দাও! আমরা ১০ দিন কাজ না করলেও আমাদের ১০ দিনের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে!’ বাড়িওয়ালারা পুরো মাসের ভাড়া দাবি করছিল, কিন্তু ভাড়াটিয়ারা বলছিল, ‘মাস তো শেষ হয়েছে ২০ দিনে, আমরা ১০ দিনের ভাড়া কেন দেব?’ ইংল্যান্ডসহ বেশ কিছু প্রটেস্ট্যান্ট দেশ পোপের এই সিদ্ধান্তকে ক্যাথলিক ষড়যন্ত্র বলে মনে করেছিল। তারা বহু বছর ধরে এই নতুন ক্যালেন্ডার গ্রহণ করতেই অস্বীকার করে।
জন্ম হলো ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’
সব বিতর্ক আর জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ১৫৮২ সালের ৫ অক্টোবর থেকে নতুন ক্যালেন্ডার কার্যকর হয়, যা পোপের নামানুসারে ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ নামে পরিচিত লাভ করে। এই সিস্টেমে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষের নিয়মে সূক্ষ্ম পরিবর্তন এনে সময়কে একদম প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়। আজ আমরা সারা বিশ্বে যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে দিন হিসাব করি, তা মূলত সেই রাতে জন্ম নেওয়া নতুন সময় গণনা পদ্ধতি।
ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট মাস
১৫৮২ সালের অক্টোবর মাসটি আজও পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ও অদ্ভুত মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় এটিই একমাত্র মাস, যা ছিল মাত্র ২১ দিনের!
পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭৫২ সালে যখন এই ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে, ততদিনে ব্যবধান বেড়ে ১১ দিন হয়েছিল। ফলে তাদের ক্যালেন্ডার থেকে বাদ দিতে হয়েছিল ১৭৫২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত!
একটি রাতের ঘুমে ১০টি দিন হারিয়ে যাওয়ার এই রোমাঞ্চকর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সময় কেবল ঘড়ির কাঁটা বা কাগজের পাতা নয়, এটি মহাবিশ্বের এমন এক অনন্ত স্রোত, যাকে ধরে রাখার জন্য মানুষকে কতটা চতুরতার আশ্রয় নিতে হয়েছে!