ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকার ভীত হয়ে বিক্ষোভ দমনে বিরোধী নেতা-কর্মীদের আটক করছে। তাদের ভাষ্য, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলনকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পরিণত করেছেন। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘লড়াই সবে শুরু’।
প্রতিরোধমূলক আটকের পর দিল্লির একটি আদালত থেকে মুক্তি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর রোববার (১১ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সিজেপির সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা।

মুক্তি পেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস। পাশেই আশুতোষ রাঙ্কা। ছবি: সংগৃহীত
তিনি বলেন, ‘গত ৭২ ঘণ্টায় দেশ চরম স্বৈরাচার প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে, যারা নির্ধারিত স্থানে বিক্ষোভ দেখাতে চেয়েছিলেন।’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে দায়ী করে রাঙ্কা বলেন, ‘পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে গতকাল বিমান থেকে আমাদের অপহরণ করা হয়েছিল।’
দিল্লির নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়কার পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি বলেন, ‘গত ৭২ ঘণ্টায় যা ঘটেছে, তা আমাদের বাবা-মায়ের কাছে শোনা জরুরি অবস্থার ঘটনাকেও ছাপিয়ে গেছে।’
রাঙ্কার অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী মোদি ও অমিত শাহ সেটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পরিণত করেছেন। নির্বাচন কমিশন দেশে গণতন্ত্র রক্ষা ও শক্তিশালী করার দায়িত্ব পালন না করে বিজেপিকে নির্বাচনে জেতাতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে কাজ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ ডিপকের দাদির মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাঙ্কা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অমানবিক আচরণের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ডিপকে যখন দাদির মৃত্যুর খবর পান, তখনো পুলিশ ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন নিয়ে হাজির হয়ে ঘটনাটিকে তামাশায় পরিণত করার চেষ্টা করে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ডিপকে বারবার অনুরোধ করলেও পুলিশ তাতে কর্ণপাত করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। ডিপকের বাবা-মা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তারা সহজেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বলেও জানান রাঙ্কা।
‘লড়াই সবে শুরু হয়েছে’ উল্লেখ করে সিজেপির এই নেতা বলেন, পরিস্থিতিকে যুদ্ধে পরিণত করার জন্য সরকারের লজ্জিত হওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলনের আগে ডিপকে জানান, তিনি দাদির শেষকৃত্যে যোগ দিতে মহারাষ্ট্রে নিজের গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সিজেপি পিছু হটবে না, কোনো হুমকিতেও ভয় পাবে না।
ডিপকের ব্যক্তিগত শোকের ঘটনায় সমবেদনা জানিয়ে রাঙ্কা বলেন, ‘অভিজিৎ এমন কেউ নন, যিনি নিজের শোক নিয়ে লোকদেখানো কোনো আচরণ করবেন। শোকের এই মুহূর্তে আমরা সবাই তার পাশে আছি।’
অন্যদিকে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় বিরোধী দলের নেতাদের ধন্যবাদ জানিয়েছে সিজেপি। রাঙ্কা বলেন, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক সরকার ও পিনারাই বিজয়ন যেভাবে ছাত্র ও যুবসমাজের সঙ্গে রাস্তায় নেমে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, তার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ দলটি।
এ ছাড়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া (এসএফআই) ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-সহ বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর সদস্যদের ‘নির্মমভাবে আটক’ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন রাঙ্কা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে সিজেপি নেতারা জানান, আটক, গ্রেফতার ও হুমকির মুখেও তারা কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন না।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় অভিজিৎ দীপকে বলেন, তিনি বা তার দলের নেতৃত্ব সরকারের কাছে প্রতিবাদ না করার কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি দেননি। ফলে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে নিজেদের দাবি আদায়ে তারা খুব শিগগিরই আবার রাজপথে নামবেন।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশনের দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত। কমিশনের দাবি, মৃত ব্যক্তি, একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটার এবং অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম বাদ দিতেই নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তবে বিরোধী দল ও সিজেপির অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে বহু মানুষ তাদের নাম অন্যায়ভাবে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।
সিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতি পক্ষপাত দেখাচ্ছেন। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) নির্বাচন কমিশনের অনিয়মের প্রতিবাদ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেয় সিজেপি। এতে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণরা দিল্লিতে জড়ো হন। এরপর গণআটক চালায় মোদি সরকার।