Tuesday 13 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রংপুরের মাদক নিরাময় কেন্দ্র লালমনিরহাটে সরানোর প্রস্তাবে নগরবাসীর ক্ষোভ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৪

রংপুর: রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রংপুর সদর থেকে সরিয়ে লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাব প্রকাশ্যে আসার পর রংপুরে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর ডিও লেটারের ভিত্তিতে এই প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে বিএনপির স্থানীয় নেতারা প্রকল্পটি রংপুরেই বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জোসেফা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত কাঠামো বিভাগের সদস্যের (সিনিয়র সচিব) কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চাওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চিঠি অনুযায়ী, প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপিতে কেন্দ্রটি রংপুর সদর উপজেলার মন্থনা মৌজায় নির্মাণের কথা ছিল। সেখানে বিভিন্ন খতিয়ানে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত জমি তিন ফসলি হওয়ায় জমির মালিকেরা লিখিতভাবে আপত্তি জানান। ফলে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা সৃষ্টি হয়।

এরপর মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটে কেন্দ্র স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দেন। সেই ভিত্তিতে লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বৈরাগিকুমুর ও নওদাবস মৌজায় মোট ১০ একর জমি প্রস্তাব করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, লালমনিরহাটে কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হলে প্রকল্প এলাকা বদলে যাবে এবং তখন ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। ডিও পত্র অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চাওয়া হয়েছে এবং ডিপিপি সংশোধনের সময় বিষয়টি যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যার নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা এবং প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়েছে।

গত ২৫ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাত বিভাগীয় শহরে কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বাস্তবায়ন করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। সারাদেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র মাত্র চারটি-তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় কেন্দ্রের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় আঞ্চলিক কেন্দ্র থাকলেও রংপুরের মানুষের জন্য সরকারি কোনো সেবা ছিল না।

রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষ চিকিৎসাসহ নানা সেবার জন্য বিভাগীয় সদরের ওপর নির্ভরশীল। অথচ অধিগ্রহণের জন্য প্রস্তাবিত জমি নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে রংপুর সদরে বিকল্প জায়গায় জমি খোঁজা হয়েছে কি না, চিঠিতে তার কোনো উল্লেখ নেই। বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত প্রকল্প কেন অন্য জেলায় নেওয়া হচ্ছে সে বিষয়েও কোনো যুক্তি দেওয়া হয়নি।

রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রস্তাবে ক্ষোভ জানিয়েছেন রংপুরের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির স্থানীয় নেতারাও।

রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, “বিভাগীয় নামে একটি প্রকল্প ঠুনকো অজুহাতে একটি জেলায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই চিঠি প্রকাশের আগে আমরা জানতামই না যে সরকার এ জন্য জমি অধিগ্রহণ করছে এবং সেখানে জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কথা বলা হলেও আমাদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হয়নি।” তিনি আরও বলেন, সরকারি এ ধরনের প্রকল্পের জন্য রংপুরে প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাবে।

রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করেই রংপুরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’ অন্য কোনো জেলা নিজ এলাকায় প্রকল্প চাইলে সেটি আলাদাভাবে করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, রংপুরেই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘কোথায় কেন্দ্রটি স্থাপন করলে পুরো বিভাগের মানুষ সেবা পাবে, তা সমতা ও সুষমতার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে। রংপুর এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখান থেকে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাটের মোগলহাটের দূরত্ব প্রায় সমান। ফলে সেবাধর্মী কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে স্থাপন করা হলে সেবা শতভাগ নিশ্চিত হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় প্রকল্পের বড় অংশ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চলে যেত। এখনো মন্ত্রীরা যদি প্রকল্প নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে যান, তাহলে সমতা বজায় থাকবে না।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন বলেন, প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি অধিগ্রহণের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়ে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়। এরপর অধিগ্রহণের গণবিজ্ঞপ্তি জারিসহ পরবর্তী সব ব্যবস্থা নেয় জেলা প্রশাসন। তবে পরে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসন তাদের জানায়, সেখানে কিছু জটিলতা রয়েছে এবং তারা তা সমাধানের চেষ্টা করছে।

মাসুদ হোসেন আরও বলেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে তারা জানতে পেরেছেন যে প্রকল্পটি লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প পরিচালক সম্প্রতি লালমনিরহাটে গিয়ে প্রস্তাবিত জায়গা দেখে এসেছেন। তবে প্রকল্পটি রংপুরে বাস্তবায়নের জন্য তারা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে রংপুরের জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর