লক্ষ্মীপুর: গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নারিকেল চাষ ও এর বাণিজ্য এক অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। লক্ষ্মীপুর জেলার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারিকেল এখন শুধু একটি অর্থকারী ফসলই নয়, বরং হাজারো পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান চালিকাশক্তি। চলতি মৌসুমেও জেলাটিতে নারিকেলের বাম্পার ফলন হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা।
কৃষিনির্ভর এই উপকূলীয় জেলাটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো ভারী শিল্পকারখানা না থাকায় এখানকার অধিকাংশ মানুষ জমিতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙিনায় ও পতিত জমিতে গড়ে তোলা নারিকেল গাছের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জেলার প্রতিটি বাড়িতেই কম-বেশি নারিকেল গাছ রয়েছে। কোনো কোনো পরিবারের ১৫-২০টি গাছই তাদের পুরো সংসার খরচ জোগাতে সাহায্য করে। আবার যাদের বাণিজ্যিক বাগান রয়েছে, তারা বছর শেষে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুরে প্রায় ২ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে নারিকেল বাগান রয়েছে। এসব বাগান ও বসতবাড়ির গাছ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৫ কোটি ৩০ লাখ নারিকেল উৎপাদিত হয়। গুণগত মান ভালো ও সুস্বাদু হওয়ায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ট্রাক ও নৌপথে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে এ জেলার নারিকেল। বাজারে প্রতি জোড়া নারিকেল ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জেলার হাট-বাজারগুলোতে সপ্তাহে দুদিন নারিকেলের বিশাল সমাগম ঘটে। বিশেষ করে সদর উপজেলার দালাল বাজার, রসুলগঞ্জ, চন্দ্রগঞ্জ, মান্দারী; রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ; রামগঞ্জ শহর; কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট এবং রামগতির আলেকজান্ডার নারিকেলের প্রধান মোকাম হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে দালাল বাজারে বসে জেলার সবচেয়ে বড় নারিকেলের হাট।
নারিকেল সংগ্রহ, ক্রয়-বিক্রয় এবং ছাল (ছোবড়া) ছাড়ানোর কাজে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান হয়েছে শত শত নারী-পুরুষের। শুধু নারিকেলই নয়, এর ছোবড়াও বাজারে ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। যা দিয়ে তৈরি হচ্ছে জাজিম, পাপোশ, ওয়ালমেটসহ হরেক রকমের হস্তশিল্প পণ্য।
সদর উপজেলার বাসিন্দা বেলাল হোসেন জানান, তার ১৬-১৫টি গাছ থেকে সংগৃহীত নারিকেল বিক্রি করেই সারা বছর সংসার খরচ চলে। অন্যদিকে, কমলনগরের ব্যবসায়ী মঞ্জুর আলম বলেন, ‘দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নারিকেলের ব্যবসা করে সফল হয়েছি। এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় এটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা।’
নারিকেলকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এলেও এখনো পর্যাপ্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত চাষি ও ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়ভাবে নারিকেলভিত্তিক তেল বা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা না থাকা এবং অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে অনেক সময় চাষিরা নায্যমূল্য পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, জেলায় এখনো অধিকাংশ নারিকেল গাছ অপরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়। পরিকল্পিত চাষাবাদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি লক্ষ্মীপুরে যদি নারিকেলভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায়, তবে বেকারত্ব লাঘবের পাশাপাশি চাষিরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাবেন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল বিপ্লব ঘটবে।
লক্ষ্মীপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লক্ষ্মীপুরে বিপুল পরিমাণ নারিকেল উৎপাদিত হয়। এখানে নারিকেলভিত্তিক প্রসেসিং বা তেল উৎপাদনের কারখানা স্থাপন করা গেলে কৃষকরা যেমন সরাসরি লাভবান হবেন, তেমনি সার্বিক জাতীয় অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।