কুষ্টিয়া: আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আজ থেকে শুরু হচ্ছে তিনদিনের লালন স্মরণোৎসব। এ উপলক্ষ্যে লালন আখড়াবাড়িতে আয়োজন করা হয়েছে সাধুসঙ্গ ও মেলার। এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা আখড়াবাড়িতে এসে সমবেত হয়েছে। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মরমি সংগীতকে ঘিরে উৎসবস্থলে তৈরি হয়েছে প্রাণবন্ত পরিবেশ। তিনদিনের এ আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা।
কুষ্টিয়া শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি। বছরের এই সময়টিতে আখড়াবাড়ি ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন লালনভক্ত ও বাউল সাধকেরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। স্মরণোৎসবকে কেন্দ্র করে আখড়াবাড়ির বারামখানার আশপাশে জড়ো হয়েছেন অসংখ্য সাধু-বাউল। একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান, গান ও আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। তাদের উপস্থিতিতে আখড়াবাড়ি এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন বলে প্রচলিত রয়েছে। তার তিরোধানের পর থেকেই ভক্ত-অনুসারীরা নানা আয়োজনে স্মরণ করে আসছেন তাকে। সময়ের পরিক্রমায় লালন স্মরণোৎসব পরিণত হয়েছে বাউল সাধক, সংগীতপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের এক বৃহৎ মিলনমেলায়। প্রতিবছর এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে লালনের গান, দর্শন ও মানবিক ভাবধারা নতুন করে আলোচনায় আসে।
স্মরণোৎসব ঘিরে এবার দর্শনার্থীদের আগমনও চোখে পড়ার মতো। কেউ আসছেন লালন আখড়াবাড়ি ঘুরে দেখতে, কেউ বাউল গান শুনতে, আবার কেউ লালনের জীবন ও দর্শন সম্পর্কে জানতে। আখড়াবাড়ির পরিবেশ, সাধু-বাউলদের জীবনাচার এবং মরমি গানের প্রতি আগ্রহ থেকে অনেকেই প্রতিবছর এ উৎসবে অংশ নেন। দর্শনার্থীদের অনেকে মনে করেন, এমন আয়োজন বাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
আখড়াবাড়ির পাশে কালীনদীর পাড়ে বসা গ্রামীণ মেলাও এ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। মেলায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা, বিভিন্ন পণ্যের পসরা এবং উৎসবকে ঘিরে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পুরো এলাকাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
উৎসবে অংশ নেওয়া বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা মনে করেন, লালন সাঁইয়ের গান মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বোধ জাগিয়ে তোলে। বর্তমান সময়েও তার দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। তাই শুধু স্মরণোৎসবে অংশ নেওয়া নয়, লালনের মানবিক বাণী নিজেদের জীবনেও ধারণ করার প্রত্যাশা তাদের।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনদিনব্যাপী এ স্মরণোৎসব। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, আজ ৩টায় লালন আখড়াবাড়ির পাশে মরা কালীগঙ্গা নদীর তীরে উন্মুক্ত মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের উদ্বোধন করবেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। পরে গভীর রাত পর্যন্ত চলবে লালন সংগীত।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘লালন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর করা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে আখড়াবাড়ি এলাকায় বাড়তি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উৎসবের বিভিন্ন আয়োজন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এবং সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণ নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান।