Saturday 17 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

নদী ও সৃষ্টির ভাবনায় নজর কাড়ছে বনানীর শারদীয় মণ্ডপ

নাজনীন আক্তার, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪১ | আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৫

রাজধানীর বনানীর পূজামণ্ডপ -ছবি : সারাবাংলা

ঢাকা: সারাদেশের মতো ঢাকায় শারদীয় দুর্গোৎসবের বর্ণিল আলোয় এখন ঝলমল করছে পুরো রাজধানী। পাড়ায় পাড়ায় বা মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে ঢাকের বোল, কাঁসরের ধ্বনি আর ধূপের সুবাস ছড়ানোর ব্যস্ততা। শহরবাসীর চোখে-মুখে এখন কেবলই উৎসবের আনন্দ। তবে নানা রঙের প্রতিমা ও আলোকসজ্জার ভিড়ে এবারের পূজায় শিল্পরসিকদের সব আকর্ষণ কেড়ে নিয়েছে ‘গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন’-এর অনন্য আয়োজন। বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার নদীমাতৃক জীবন, সৃষ্টিতত্ত্ব ও দেবীর মাতৃরূপের এক অপূর্ব সম্মিলন-যার থিম ‘জলজ’।

বনানীর ‘জলজ’: নদী, সৃষ্টি ও মাতৃশক্তির অনবদ্য রূপায়ণ

বিজ্ঞাপন

‘জলজ’ অর্থ জল থেকে যার জন্ম। সনাতন সৃষ্টিচিন্তায় জল পবিত্রতা, আশ্রয় ও সৃষ্টির সম্ভাবনার পরিচায় বহন করে। পূজার ঘটস্থাপন থেকে তর্পণ ও বিসর্জনেও জলের উপস্থিতি অনিবার্য। এই ধর্মীয় অনুষঙ্গের সঙ্গে মণ্ডপের ভাবনায় যুক্ত হয়েছে মাতৃত্বের সম্পর্ক। মাতৃগর্ভের জলীয় পরিবেশ যেমন নতুন জীবনকে ধারণ করে, নদীও তেমনি তার প্রবাহে জনপদ, কৃষি ও অসংখ্য প্রাণকে লালন করে। দেবীর মাতৃরূপকে এই জীবনধারণের শক্তির মধ্য দিয়েই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে ‘জলজ’।

রাজধানীর বনানীর পূজামণ্ডপ -ছবি : সারাবাংলা

পৌরাণিক ও বৈদিক দর্শন অনুযায়ী, সৃষ্টির আদি রূপ বর্ণনায় বলা হয়েছে, সৃষ্টির পূর্বে সর্বত্রই ছিল অন্ধকারে আচ্ছন্ন এক অসীম জলরাশি। সনাতন দর্শনে পঞ্চমহাভূতের অন্যতম ‘অপ’ বা জল এমন এক মৌলিক উপাদান, যা প্রকৃতির প্রতিটি কণায় সঞ্চার করে জীবনের স্পন্দন। নদী, বৃষ্টি ও সমুদ্রের সঙ্গে বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত জলের এই চিরন্তন অস্তিত্বকেই বনানীর এই আয়োজনে পরম যত্নে ধারণ করা হয়েছে।

স্থাপত্য ও নান্দনিকতায় প্রাকৃতিক উপাদানের কারুকাজ

বনানী কামাল আতাতুর্ক পার্কের মণ্ডপটি দেখলে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যাবে। সম্পূর্ণ কৃত্রিমতামুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে এতে ব্যবহার করা হয়েছে বেত, বাঁশ, চটসহ প্রায় ৩৬ ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান।

রাজধানীর বনানীর পূজামণ্ডপ -ছবি : সারাবাংলা

খ্যাতিমান স্থপতি অমিতি কুন্ডু এবং শিল্পী-গবেষক পার্থপ্রতিম সাহার যৌথ পরিকল্পনা ও নিপুণ তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে এই বিশাল জলজ জৈব রূপকল্প (Organic Form)। বাঁশ ও চটের বুননে তৈরি করা হয়েছে ঢেউখেলানো বহুস্তরীয় দৃশ্যপট। কৃত্রিম জলপ্রপাত, প্রতিফলন-পুকুর (রিফ্লেকশন পুল) এবং আলোর সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি হয়েছে এক রূপান্তরশীল পরিবেশ। প্যান্ডেলের ঠিক কেন্দ্রে পদ্মের আদলে নির্মিত বিশাল শঙ্খপটে পরম মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন মা দুর্গা।

শিল্পীদের ভাবনা ও শিল্পীসত্তা

এই শৈল্পিক কর্মযজ্ঞের পেছনের ভাবনা ও কষ্টের কথা তুলে ধরে থিম ডিজাইনার ও শিল্পী পার্থপ্রতিম সাহা বলেন, “জল আমাদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। আধুনিকতার ভিড়ে আমরা প্রকৃতি ও নদীকে ভুলতে বসেছি। সনাতন ধর্মে ঘট থেকে শুরু করে বিসর্জন-সবকিছুতেই জলের উপস্থিতি রয়েছে। আমরা চেয়েছি বাঁশ, বেত ও চটের মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে সেই তরঙ্গের রূপ ফুটিয়ে তুলতে, যা দর্শনার্থীদের শুধু সৌন্দর্যই দেখাবে না, বরং ভাবাবে।”

বনানীর এই নান্দনিক মণ্ডপে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে মণ্ডপে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী তানজিম আহমেদ বলেন, “এর আগে এমন থিমভিত্তিক পূজা মণ্ডপ দেখিনি। বনানীর এই ‘জলজ’ থিমটি চোখের শান্তি এনে দেয়। বাঁশ ও চট দিয়ে যে এত সুন্দর ঢেউ ও জলপ্রপাতের আবহাওয়া তৈরি করা যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস হতো না। মায়ের প্রতিমা এবং চারপাশের পরিবেশ এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শান্তির সৃষ্টি করেছে।”

রাজধানীর বনানীর পূজামণ্ডপ -ছবি : সারাবাংলা

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী প্রিয়তি সাহা বলেন, “শুধু আলোকসজ্জা নয়, এই মণ্ডপের মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর বার্তাও দেয়া হয়েছে, জল ও নদী রক্ষা করা আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই জরুরি। প্রতিমার রূপ আর প্যান্ডেলের স্থাপত্যশৈলী সত্যি অতুলনীয়।”

সব মিলিয়ে, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত বনানীর এই মণ্ডপটি কেবল একটি পূজামণ্ডপ নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতি ও শিল্পের এক মেলবন্ধনের জীবন্ত প্রদর্শনী। ইট-কাঠের যান্ত্রিক এই রাজধানীতে রূপসী বাংলার নদী আর জলের অবয়ব ফুটিয়ে তুলে এবারের শারদোৎসবে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে ‘গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন’।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর