Monday 19 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ভক্তি, প্রার্থনা ও উৎসব-আমেজে পালিত হলো মহা অষ্টমী

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৫৬ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:১২

ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ঢাক-ঢোল, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশনে শুরু হয়েছে মহা অষ্টমীর কুমারীপূজা।

সোমবার (১৯ অক্টোবার) ভোর ৬টা ১০মিনিটে রামকৃষ্ণ মিশনে মহাঅষ্টমীর পূজা দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। এরপর বেলা ১১টায় শুরু হয় কুমারীপূজা, চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এদিনের মূল আকর্ষণ কুমারীপূজা।

কুমারীপূজার জন্য সাধারণত ২ থেকে ১২ বছর বয়সী এক বা একাধিক কন্যাকে বেছে নেওয়া হয়। তাদের দেবীর রূপে স্নান করিয়ে শুদ্ধ পোশাকে সাজানো হয়। এরপর পূজার আসনে বসিয়ে চরণ ধৌত করে ফুল, চন্দন, সিঁদুর, ধূপ-ধুনা দিয়ে পূজা করা হয়।

সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বহু বছর আগে নিজের স্ত্রী সারদা দেবীকে মাতৃজ্ঞানে যে পূজা করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে উপমহাদেশের রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠগুলোতে এই পবিত্র আচারটি নিয়মিতভাবে পালন করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দও এর ঐতিহাসিক বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ স্মরণ করিয়ে দেন, বেলুড় মঠে যখন প্রথম দুর্গাপূজা হয়েছিল, তখন স্বামী বিবেকানন্দ স্বয়ং কুমারী পূজা করেছিলেন। সেবার নয়টি কুমারীর পূজা করা হয়েছিল, যার মধ্যে একটিতে তিনি নিজে অংশ নেন।

পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজের মতে, এই পূজার পরিধি অত্যন্ত উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। সাধারণ ধারণায় কেবল ব্রাহ্মণকন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করার কথা ভাবা হলেও, স্বামী বিবেকানন্দ ব্রাহ্মণকন্যা ছাড়াও অব্রাহ্মণ এমনকি অহিন্দু কুমারীকেও আদ্যাশক্তি জ্ঞানে পূজা করেছিলেন। এই পূজার অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো মানববন্দনা, নারীজাতির সম্মান ও মর্যাদার প্রতিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের নিভৃত আরাধনা। নারীজাতির সার্বিক মর্যাদা রক্ষা এবং সমাজের প্রতিটি নারীর ভেতরের পবিত্রতাকে সম্মান জানানোর এক অনুপম বার্তা বহন করে এই উৎসব।

রাজধানীর গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে মহাষ্টমীর সকালে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় ছিলো। সকাল পৌনে ১০টায় মিশন প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় কুমারী পূজার আয়োজন। এবারের পূজায় কুমারী রূপে দেবীর আসনে বসেছিল ৬ বছরের শিশু ইর্যা চক্রবর্তী; শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী যার নামকরণ করা হয়েছিল ‘উমা’।

হিন্দুশাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, ১ থেকে ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কন্যাদের বয়সভেদে বিভিন্ন নামে ভূষিত করা হয়। যেমন এক বছর বয়সী কন্যা ‘সন্ধ্যা’, দুই বছরে ‘সরস্বতী’, তিন বছরে ‘ত্রিমূর্তি বা ত্রিধামূর্তি’, চার বছরে ‘কলিকা’, পাঁচ বছরে ‘সুভাগা’ এবং ছয় বছর বয়সে তাকে ‘উমা’ বলা হয়। এরপর সাত বছরে মালিনী, আট বছরে কুব্জিকা, নয় বছরে কালসন্দর্ভা, দশ বছরে অপরাজিতা, ১১ বছরে রুদ্রাণী, ১২ বছরে ভৈরবী, ১৩ বছরে মহালক্ষ্মী, ১৪ বছরে পীঠনায়িকা, ১৫ বছরে ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ১৬ বছর বয়সী কুমারীকে ‘অন্নদা’ নামে অভিহিত করা হয়।

পূজার নির্ধারিত দিনে কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক পরানো হয়। এরপর তাকে সুদৃশ্য অলংকার, কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা এবং হাতে ফুল দিয়ে সাজিয়ে সুসজ্জিত আসনে বসানো হয়। ষোড়শোপচারে অর্থাৎ ষোলোটি উপাচারের মাধ্যমে তাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করেন পুরোহিতরা। এ সময় চারপাশের ভক্তরা কুমারীকে সদ্ধর্মে প্রণাম করে নিজেদের জীবন ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করেন।

সকাল বেলাতেই নতুন পোশাকে মন্দিরে আসতে থাকেন হিন্দু সম্প্রদায়ের সব বয়সী মানুষরা। হাত তুলে প্রার্থণা করেন, দেশ ও পরিবারের মঙ্গলের জন্য।

কুমারী পূজা দেখতে আসা সুব্রত কর্মকার বলেন, প্রতিবছর মহাষ্টমীতে আমি পরিবার নিয়ে এখানে আসি। কুমারী পূজার এই রূপটি দেখার অনুভূতি অন্যরকম, চোখের সামনে যেন স্বয়ং মা দুর্গার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। এবার মার চরণে বিশেষ প্রার্থনা করেছি, যেন আমার পরিবারে সুখ ও শান্তি বজায় থাকে। পাশাপাশি দেশের সব মানুষ যেন মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করতে পারে এবং আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ ও আলোকিত হয়, মা দুর্গার কাছে এইটুকুই চাওয়া।

অর্পিতা রায় জানান, অষ্টমীর সন্ধিপূজা আর কুমারী পূজা আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও প্রাণের একটি উৎসব। আজকের দিনে মা দুর্গার কাছে আমার প্রধান প্রার্থনা হলো আমার সন্তান যেন সুস্থ ও সৎপথে বড় হতে পারে। দেশের প্রতিটি নারীর নিরাপত্তা এবং সমাজে যেন পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি অটুট থাকে, মা যেন সেই শক্তি আমাদের সবাইকে দেন।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা দিবাকর সূত্রধর বলেন, পূজার আয়োজন ও ভক্তদের সমাগম দেখে মন জুড়িয়ে গেছে। মহাষ্টমীর এই পবিত্র লগ্নে মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করেছি যেন আমাদের দেশ সব ধরনের অন্ধকার ও হানাহানি থেকে মুক্তি পায়। দেশের প্রতিটি পরিবারে যেন শান্তি ও সমৃদ্ধি নেমে আসে এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন দেশের উন্নয়নে সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারে মা দুর্গার কাছে আজ এই আশার কথাই জানিয়েছি।

‎এ বছর দেবীর আগমন ঘটেছে ঘোড়ায় চড়ে এবং আগামী দশমীর দিন দুর্গা বিদায় নেবেন নৌকায় চড়ে। মহানবমীর বিধান শেষে বিজয়া দশমীর দিন মহা-আরতির মাধ্যমে দেবীকে বিদায় জানানো হবে।

সারাবাংলা/এফএন