প্রতি বছর ২১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় ‘জাতীয় বোতাম গণনা দিবস’ বা ‘ন্যাশনাল কাউন্ট ইউর বাটনস ডে’। আপাতদৃষ্টিতে এই দিনটি একটু খামখেয়ালি কিংবা বিদঘুটে মনে হতে পারে, কিন্তু পোশাকের ক্ষুদ্রতম এই উপকরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্প কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর। প্রতিদিনের চটজলদি পোশাক পরার তাড়া ভুলে একটুখানি থেমে নিজের পোশাকে বা আলমারিতে জমা থাকা বোতামগুলো গণনার মধ্য দিয়ে মানুষ আসলে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে নতুন করে আবিষ্কার করে। সাধারণ জীবনের ধূলিমলিন ছন্দের মাঝে এই ধরনের অদ্ভূত উদযাপন আমাদের শৈশবের নস্টালজিয়া ও হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে পরম মমতায় সামনে নিয়ে আসে।
সিন্ধু সভ্যতা থেকে রাজপ্রাসাদ হয়ে আধুনিক ফ্যাশনের রূপকথা
বোতামের ইতিহাস আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার যুগে শুরু হয়েছিল। ব্রোঞ্জ যুগের সেই সময়ে প্রবাল ও ঝিনুকের খোলস কেটে তৈরি বোতাম অলঙ্কার বা সামাজিক পদমর্যাদার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, কিন্তু পোশাকে আঁটসাঁট আটকে রাখার আধুনিক ব্যবহার শুরু হতে লেগেছিল আরও বহুকাল। মধ্যযুগে ইউরোপের ধনকুবের এবং রাজপরিবারের সদস্যরা সোনা, রূপা, হাতির দাঁত ও মূল্যবান রত্ন বসানো বোতাম ব্যবহার করতেন, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। ষোড়শ শতকে শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়ায় ধাতু ও কাঁচের বোতাম গণহারে তৈরি হতে শুরু করার পরই তা সাধারণ পোশাকে স্থান পায় এবং বিংশ শতাব্দীর প্লাস্টিক বিপ্লব এর সহজলভ্যতাকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়।
পোশাক শৈলীতে বোতামের মনস্তাত্ত্বিক ও বৈপ্লবিক রূপান্তর
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন পুরুষদের শার্টের ডানদিকে আর নারীদের জামায় কেন বাঁদিকে বোতাম থাকে? ইতিহাস বলে, ভিক্টোরীয় যুগে উচ্চবংশীয় নারীদের পোশাক পরাতে সাহায্য করতেন দাসীরা, তাই কাজের সুবিধার জন্য তাদের পোশাকে বাঁদিকে বোতাম বসানো হতো, যা আজকের যুগেও ঐতিহ্য হিসেবে বজায় রয়েছে। আবার সামরিক পোশাকে বোতামের ব্যবহার কেবল সৌন্দর্য বাড়ায়নি, বরং প্রতিপক্ষ সৈনিকের অবস্থান শনাক্তকরণ বা ইউনিফর্ম টেকসই করার কাজেও লেগেছে। আধুনিক ফ্যাশন ডিজাইনে একটি সামান্য বোতাম সাধারণ পোশাকের পুরো চেহারা বদলে দিতে পারে, যা সাধারণ কাটিংয়ের পোশাককে মুহূর্তেই রাজকীয় রূপ দান করতে সক্ষম।
জমানো বোতামের বাক্সে স্মৃতি ও নস্টালজিয়ার নতুন মেলা
আমাদের প্রায় প্রতিটি বাঙালির ঘরেই মা কিংবা দাদিদের সেলাইয়ের বাক্সে একটা পুরোনো কৌটো থাকে, যেখানে জমে থাকে হরেক রকমের আলগা বোতাম। ছোটবেলার সেই স্কুলে পরা জামার বেঁচে যাওয়া বোতাম কিংবা পছন্দের কিন্তু পুরোনো হয়ে বাতিল হওয়া কোটের স্মরণীয় স্মারক জড়িয়ে থাকে সেই কৌটার ভেতরে। ২১ অক্টোবরের এই বিশেষ দিনটিতে তাই ড্রয়ারে জমে থাকা পুরোনো সেই কৌটা খুলে বসে বোতাম গোনার মানে হলো স্মৃতির অ্যালবামের পাতাগুলো উল্টে দেখা। বর্তমানের ডিজিটাল ও দ্রুতগতির জীবনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় এমন একটি অনন্য আয়োজনে মেতে ওঠা কেবল বিনোদনই যোগায় না, মানসিক ক্লান্তি দূর করতেও দারুণ কাজে দেয়।
একটি ছোট বোতামের গণনায় নতুন এক দিনের মিষ্টি ইতি টানা
তাহলে আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব নয়, ঘড়ির কাঁটার বিরামহীন তাড়া ভুলে আজই খুলে ফেলুন নিজের আলমারি আর হিসাব শুরু করুন আপনার চারপাশে কত শত রঙের ও স্বাদের বোতাম জড়িয়ে রয়েছে। হয়তো কোনো একটা বিশেষ বোতামের স্পর্শে মুহূর্তেই আপনার মনে পড়ে যাবে শৈশবের প্রথম স্কুলের পোশাকের কথা কিংবা বিশেষ কোনো মানুষের উপহার দেওয়া প্রিয় পোশাকটির গল্প। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এমন ক্ষুদ্রতম খুঁটিনাটি আনন্দকে মূল্য দেওয়ার মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায় বেঁচে থাকার আসল সার্থকতা। তাই আজকের দিনটি শেষ হওয়ার আগেই নিজের পোশাকে থাকা বোতামগুলো আরেকবার আঙুল ছুঁয়ে গুনে নিন এবং জীবনের সাধারণ অনুষঙ্গের মাঝে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ আনন্দকে স্বাগত জানান।