জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স । শনিবার (২৪ অক্টোবর) এ বিক্ষোভে দেশটির বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষের অংশ নেয়। দিনের শেষ দিকে কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এ সময় দেশজুড়ে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। সংঘর্ষে ৫৩ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস, মার্সেই, বোর্দো ও লিওঁসহ কয়েকটি শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। মার্সেইয়ে ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া হয় এবং বোর্দোতে সড়ক অবরোধের চেষ্টা চালানো হয়। লিওঁতে নিষিদ্ধ এলাকায় জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের সরাতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, প্যারিসে মিছিলের পেছনের অংশে কয়েক হাজার উগ্রপন্থী জড়ো হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনকে দাঙ্গাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। রাজধানীতে শনিবার ১৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা গত সপ্তাহের একই দিনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
তবে কয়েকটি শহরে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। নুনেজ জানান, তুলুজ ও ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরে দুজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ফ্রান্সইনফোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুলুজে ২০ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর কাছে বিস্ফোরণ ঘটলে তার এক হাতের কয়েকটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ কর এবং সরকারের নীতির কারণে সাধারণ মানুষ চাপে রয়েছেন। প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া জেলি নামের এক নারী বিবিসিকে বলেন, মানুষ দীর্ঘদিনের হতাশা থেকেই রাস্তায় নেমেছে। তার ভাষ্য, সরকার মানুষের কথা শুনছে না। অন্যদিকে, মুখোশ পরা দুই কিশোর বিক্ষোভকারীও নিজেদের প্রজন্মকে অবহেলিত মনে করার কথা জানায়। তাদের একজন বলেন, লুটপাট সমর্থনযোগ্য নয়, তবে দারিদ্র্য ও পুলিশের সহিংসতাও চলমান ক্ষোভের কারণ।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভে ৫ লাখ ৫০ হাজারের মতো মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সংঘর্ষ ও লুটপাটে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি গ্রেফতার হন। দুই হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়; ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো বলে জানিয়েছে ফ্রান্সের চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি।
এদিকে ফ্রান্সের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও তার সরকারের সমালোচনা করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। উগ্র ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি এবং বামপন্থী লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতারা চলমান পরিস্থিতির জন্য সরকারকে দায়ী করেছেন। তবে বিক্ষোভে সহিংসতা ও লুটপাটের সমালোচনাও করেছেন ডানপন্থী নেতারা।
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্পেনের বার্সেলোনায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর ১২০ জনের বেশি গ্রেফতার হয়েছেন। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানা ও বেলজিয়ামের ব্রাসেলসেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ইতালির মিলানে বিক্ষোভ ঠেকাতে বড় ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মধ্যে ফ্রান্সের সরকার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি নীতি নিয়ে ক্ষোভ অব্যাহত থাকায় দেশটির পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।