রংপুর: ঘন কুয়াশা আর ভোরের হিমেল হাওয়া- প্রকৃতি যেন আগেভাগেই জানিয়ে দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। রংপুর, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে কুয়াশার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে উত্তরাঞ্চলের কোথাও কোথাও হালকা শীতের অনুভূতি হতে পারে।
ভোরে কুয়াশা, দিনে গরম
রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, ভোরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনশীলতার কারণে ভোরে কুয়াশা দেখা দিচ্ছে। তার মতে, শরৎকালের শুরুতে মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তনের কারণেই আবহাওয়ায় এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় আকাশে মেঘ থাকার পর হঠাৎ মেঘ সরে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ায় ভোরের দিকে কুয়াশা তৈরি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রয়েছে।
এদিকে, দিনের বেলায় শরতের রোদ ও উষ্ণতা থাকলেও ভোর ও রাতে হালকা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। বিশেষ করে খোলা মাঠ, চরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় শীতলতার অনুভূতি তুলনামূলক বেশি। ফলে একই দিনে উত্তরাঞ্চলের মানুষকে একদিকে ভোরের শীতলতা, অন্যদিকে দিনের গরম দুই ধরনের আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ভোরের ঘন কুয়াশার কারণে রংপুর, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাটে সড়কে দৃশ্যমানতা কমে যাচ্ছে। কুয়াশা ঘন হলে কয়েক হাত দূরের বস্তুও স্পষ্ট দেখা যায় না। ফলে অনেক চালক হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরগতিতে ও সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছেন। তবে সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো দেখা দিলে ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে যাচ্ছে এবং স্বাভাবিক হয়ে আসছে সড়ক ও জনজীবন।
কৃষকের ব্যস্ততা ও শীতের প্রস্তুতি
রংপুরে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক গভীর। হেমন্তের এই সময়ে কৃষকের চোখ থাকে মাঠের ফসলের দিকে। কোথাও আমন ধান কাটার প্রস্তুতি, কোথাও ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। আবার অন্যদিকে শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেক কৃষক।
রংপুরের গঙ্গাচড়ার চর ইচলির কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে ঘন কুয়াশা থাকায় জমিতে কাজ করতে যেতে কিছুটা ভয় লাগছে। কুয়াশার কারণে মাঠে দৃশ্যমানতা কমে যায়।’
ঋতুবদলের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রংপুরের শহর ও হাটবাজারেও। শীতের পোশাক, চাদর, কম্বল ও গরম কাপড়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে ভাবনা। কেউ পুরোনো শীতবস্ত্র পরিষ্কার করে প্রস্তুত রাখছেন, কেউবা সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক কেনার পরিকল্পনা করছেন। ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন শীতবস্ত্রের জোগান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করছেন চিকিৎসকরা। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ তানভীর আহমেদ বলেন, ‘বিরূপ আবহাওয়ার কারণে হাসপাতালে প্রতিদিনই শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক শিশু জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে।’ তিনি শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।
রংপুরের পীরগঞ্জের সোনাতলা গ্রামের বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, ‘একদিকে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ভোরে ঘন কুয়াশা। আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অসুস্থতার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।’
দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের দুশ্চিন্তা
রংপুরে শীত মানেই শুধু কুয়াশা, পিঠাপুলি আর রোদপোহানোর আনন্দ নয় বরং শীতের তীব্রতা বাড়লে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন ছিন্নমূল মানুষ, দরিদ্র পরিবারের শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং খোলা জায়গায় বসবাসকারী মানুষ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও উষ্ণ আশ্রয়ের অভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবন হয়ে ওঠে কঠিন।
নগরির বাসিন্দা আদনান আলী বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শীতের প্রস্তুতি সব সময় সহজ নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে বাড়তি শীতবস্ত্রের খরচ যোগ হলে অনেক পরিবারকে হিসাব করে চলতে হয়। বিশেষ করে যারা দিনমজুরি, কৃষিশ্রম কিংবা অনানুষ্ঠানিক পেশার ওপর নির্ভরশীল, তাদের কাছে শীতের আগমন কখনো কখনো বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই শীতে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করলে জনদুর্ভোগ অনেকটা কমানো সম্ভব।
রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় একই চিত্র
শুধু পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও নীলফামারী নয়, উত্তরাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও ভোরের দিকে কুয়াশার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কোথাও হালকা, কোথাও তুলনামূলক ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে মাঠ ও জনপদ। খোলা প্রান্তর ও চরাঞ্চলে কুয়াশার ঘনত্ব বেশি থাকছে। তবে সূর্য ওঠার পর দ্রুতই তা কেটে যাচ্ছে এবং দিনের বেলায় আবার গরম অনুভূত হচ্ছে।