ঢাকা: বিশ্ব নগরীগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণে শীর্ষস্থানে থাকা যেন বহু বছরের পরিচয়ে পরিণত হয়েছে ঢাকার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বায়ুদূষণের মাত্রা নির্ধারণকারী ইউএস এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI⁺)–এ ৩০ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার সর্বশেষ তালিকায় ঢাকা উঠেছে বিশ্বের পঞ্চম দূষিত নগরীর তালিকায়। এদিন AQI⁺ স্কোর ২১২—যা ‘ভারি অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ এই বায়ু কেবল শিশু, বৃদ্ধ বা রোগীদের জন্য নয়; সুস্থ মানুষের জন্যও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত।
শীত এলেই ঢাকায় ধোঁয়াশার চাদর নেমে আসে। সকাল-বিকেলের কুয়াশা আসলে সূক্ষ্ম ধুলিকণা (PM2.5) ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের মিশ্রণ। এগুলোর অধিকাংশই চোখে দেখা না গেলেও নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মানদণ্ড অনুযায়ী, PM2.5 এর নিরাপদ সীমা ৫ মাইক্রোগ্রাম। অথচ ঢাকায় প্রায়ই এর পরিমাণ সেই মাত্রার ২৫–৩০ গুণ বেশি থাকে।
ঢাকার চারপাশে হাজারের বেশি ইটভাটা— এর অনেকগুলোই এখনো পুরনো ‘ফিক্সড চিমনি’ পদ্ধতিতে চলছে। কয়লা ও বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া প্রতিদিন শহরের বায়ুকে বিষাক্ত করে তুলছে।
মেট্রোরেল, বিআরটি, সড়ক–ড্রেন সংস্কার—ঢাকা যেন প্রতিদিন একটি নির্মাণস্থল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, শহরের মোট বায়ুদূষণের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এসব নির্মাণকাজের ধুলা থেকে।
হাজারো পুরনো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এখনো রাস্তায় চলাচল করছে। নিম্নমানের জ্বালানি, দীর্ঘ ট্রাফিক জ্যাম ও অকার্যকর ইঞ্জিন মিলিয়ে যানবাহন ঢাকা বায়ুর অন্যতম বড় দূষক।
শহরের ভেতরে ও বাইরে ছোট-বড় শিল্পকারখানার বর্জ্য পোড়ানো, প্লাস্টিক পোড়ানো এবং খোলা স্থানে আবর্জনা পোড়ানো দূষণের আরেকটি ক্রমবর্ধমান উৎস।
PM2.5 সবচেয়ে বিপজ্জনক। এটি রক্তে প্রবেশ করে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, কিডনি—সব অঙ্গেই প্রভাব ফেলে।
হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, সিওপিডি, হৃদরোগ ও স্ট্রোক, শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত, গর্ভবতী নারীদের জটিলতা, ফুসফুস ক্যান্সার— ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে
বায়ুদূষণের কারণে ঢাকায় প্রতিবছরই ঘটে হাজারো অকালমৃত্যু— যা সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে ‘স্লো-মোশন ডিজাস্টার’-এ পরিণত হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ‘ঢাকা আজ এমন এক অস্থায়ী নগরীর মতো, যেখানে মানুষ শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করে।’
উন্নয়ন যেন ধুলা, ধোঁয়া ও বিষাক্ত বাতাসের বিনিময়ে না হয়— এমন প্রত্যাশা নগরবাসীর। এখনই কঠোর আইন প্রয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নিলে ধোঁয়াশার এই শহর একদিন সত্যিই মানুষের শ্বাসরোধ করে ফেলতে পারে।