বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে যদি একটিমাত্র ধ্রুপদী নক্ষত্রের নাম নিতে হয়, তবে তিনি সুচিত্রা সেন। আজ সেই মহানায়িকার জন্মদিন। ১৯৩১ সালের এই দিনে তৎকালীন পাবনা জেলার সদর মহকুমায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তখন তার নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। কে জানত, মধ্যবিত্ত পরিবারের সেই ডাগর চোখের মেয়েটিই একদিন নিজের চাহনি আর মায়াবী হাসিতে কয়েক প্রজন্মকে বুঁদ করে রাখবেন! ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঠিক আগে সপরিবারে কলকাতায় চলে আসেন তিনি। এরপর ব্যক্তিগত জীবনে আসে বড় বদল। প্রখ্যাত শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন রমা। সংসার আর আভিজাত্যের ঘেরাটোপে আটকে না থেকে স্বামীর উৎসাহেই রুপালি পর্দার গ্ল্যামারাস জগতে তার পা রাখা। ১৯৫১ সালে পরিচালক সুকুমার রায় তার ‘সাত নম্বর কয়েদী’ সিনেমার জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। অরোরা স্টুডিওতে যখন রমা সেনকে নিয়ে আসা হলো, তখন তার শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব পরিচালকের মন জয় করে নেয়। যদিও তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘শেষ কোথায়’ মুক্তি পায়নি, তবুও ১৯৫২ সালে ‘সাত নম্বর কয়েদী’র মাধ্যমেই টালিউডে যাত্রা শুরু হয় তার। পরিচালক নীরেন লাহিড়ীর ‘কাজরী’ সিনেমায় রমা সেন নাম বদলে তিনি হয়ে ওঠেন ‘সুচিত্রা সেন’।
১৯৫৩ সালটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের এক স্বর্ণালি মোড়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেন সুচিত্রা। এরপরের অংশটুকু নিছক অভিনয় নয়, বরং একটি অমর ইতিহাস। উত্তম-সুচিত্রা জুটি মানেই ছিল সিনেমা হলের বাইরে দীর্ঘ লাইন আর বাঙালির হৃদয়ে রোমান্টিকতার নতুন সংজ্ঞা। ‘হারানো সুর’, ‘পথে হল দেরি’, ‘সপ্তপদী’, ‘শাপ মোচন’ কিংবা ‘সাগরিকা’র মতো একের পর এক কালজয়ী সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি। সুচিত্রা সেন কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক। তার অভিনীত ‘দেবী চৌধুরানী’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘গৃহদাহ’, ‘দত্তা’ কিংবা ‘সাত পাকে বাঁধা’র মতো ছবিগুলো আজও অভিনয়ের পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি পর্দায় যখন আসতেন, তখন পারিপার্শ্বিক সবকিছু যেন ম্লান হয়ে যেত। সুচিত্রার হাত ধরেই বাংলা সিনেমায় নায়িকার চিরাচরিত অবলা ভাবমূর্তি ভেঙে এক আত্মবিশ্বাসী ও আধুনিক নারী চরিত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বাংলার গণ্ডি ছাড়িয়ে সুচিত্রা সেনের প্রতিভা ছড়িয়ে পড়েছিল বলিউডেও। ১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের ‘দেবদাস’ সিনেমায় দিলীপ কুমারের বিপরীতে পার্বতী বা পারু চরিত্রে তার অভিনয় আজও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। এই ছবির জন্যই তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে নেন। পরবর্তীতে ‘মমতা’ এবং ‘আঁধি’ সিনেমার মাধ্যমে হিন্দি বলয়ে নিজের অভিনয় প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রাখেন তিনি। বিশেষ করে ‘আঁধি’ সিনেমায় একজন রাজনৈতিক নেত্রীর চরিত্রে তার অভিনয় ছিল অবিস্মরণীয়, যা তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া অবলম্বনে নির্মিত বলে মনে করা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুচিত্রা সেন ছিলেন প্রথম সারির পথিকৃৎ। ১৯৬৩ সালে ‘সপ্তপদী’ সিনেমার জন্য মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান, যা ছিল কোনো ভারতীয় অভিনেত্রীর জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তার অভিনয়শৈলী আর পর্দায় উপস্থিতির ওজন এতটাই ছিল যে, স্বামী দিবানাথ সেনের মৃত্যুর পরও তিনি পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ চালিয়ে গেছেন এবং উপহার দিয়েছেন একের পর এক ব্যবসাফল সফল ছবি।
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পাওয়ার পর সুদীর্ঘ ২৫ বছরের অভিনয় জীবনের ইতি টানেন এই কিংবদন্তি। পর্দার আলো ঝলমলে জগত থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে নির্বাসনে নিয়ে যান তিনি। শুরু হয় তার সুদীর্ঘ অন্তরালের জীবন। প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি নিজেকে পুরোপুরি ঘরবন্দি করে ফেলেন। তার এই রহস্যময় নিভৃতবাস নিয়ে কৌতূহলের শেষ ছিল না অনুরাগীদের। এমনকি ২০০৫ সালে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘দাদা সাহেব ফালকে’ পুরস্কার দিতে চাইলেও তিনি জনসমক্ষে আসতে রাজি হননি বলে তা গ্রহণ করেননি। ২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করলে তার হয়ে সেই পুরস্কার গ্রহণ করেন কন্যা মুনমুন সেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে গেছেন এক অটল সংকল্পে। তার উত্তরাধিকার বহন করছেন কন্যা মুনমুন এবং নাতনি রিয়া ও রাইমা সেন। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি এক শীতের সকালে বাঙালির প্রিয় ‘রমা’ পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। শরীরী উপস্থিতিতে তিনি নেই সত্য, কিন্তু মহানায়িকার সেই ভুবনভোলানো হাসি আর আভিজাত্যের স্মৃতি আজও অম্লান হয়ে আছে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।