পিয়া তু আব আজা/ আহা..আআ..আহা/ মনিকা ও মাই ডার্লিং- ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বলিউড চলচ্চিত্র ‘কারাভান’ এর গানটি শুনলেই প্রথম মনে পড়ে এক কিংবদন্তি কণ্ঠস্বরের আশা ভোঁসলের নাম। গানটির সাহসী কথা এবং আশা ভোঁসলের শ্বাস নেওয়ার ভঙ্গি তখনকার সময়ের জন্য অত্যন্ত বিতর্কিত ছিল। তার গলায় এই গানের আবেদন, ও আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ শুধু সমালোচনাই সৃষ্টি করেনি একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে এই গানের সঙ্গে।
গানটি রেকর্ড করার সময় গীতিকার মজরুহ সুলতানপুরি এতটাই বিব্রত ছিলেন যে, তিনি স্টুডিও থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আশা ভোঁসলেকে বলেছিলেন, ‘বেটি, আমি খুব নোংরা গান লিখেছি। আমার মেয়েরা যখন বড় হবে, তারা এই গান গাইবে’। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ এবং অল ইন্ডিয়া রেডিওর কড়াকড়ির কারণে এই গানটি বা আশা ভোঁসলের অনেক গান সেই সময়ে নিষিদ্ধ বা সেন্সর করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এই গানটি বলিউডের অন্যতম সেরা ক্যাবারে গান হিসেবে স্বীকৃত হয়।
এক সাক্ষাৎকারে আশা তার গাওয়া সাহসী গানের পেছনের নানা কাহিনি শেয়ার করেন। তিনি জানান, একসময়ে রাহুল দেব বর্মনকে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেন, কেন সব ‘বোল্ড’ গান তাকে দেওয়া হয়, আর ‘ভালো’ গানগুলো সবই যায় লতা মঙ্গেশকরের কাছে যায়। উত্তরে রাহুল জানান, ‘পিয়া তু আব তো আজা’ গানটি সুপারহিট হবে— এই ব্যাপারে তার কোনও সংশয় ছিল না। তিনি আরও বলেন, ‘তুমি যদি আমার এই গানগুলো না গাও, তবে আমি গান বানানোই ছেড়ে দেব।’

৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে টানা তিন ঘণ্টা পারফর্ম করেছিলেন তিনি
আশা ভোঁসলে নিজেও বলেছেন, ‘আমি জানতাম সুরটা ভালো, কিন্তু এমন সুপারহিট হবে ভাবিনি।’
এই গানের মতোই ‘দম মারো দম’ গানও সময়ের সাহসী চিত্রনাট্যের অংশ ছিল। কিন্তু হিপি সংস্কৃতি আর ধূমপানের প্রতি আকর্ষণ দেখানোর জন্য সেই গান আকাশবাণী থেকে নিষিদ্ধ হয়। টিভিতেও সিনেমাটি সম্প্রচারিত হওয়ার সময় গানটি বাদ দেওয়া হয়।
আশা জানান, এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। বম্বে রেডিও তার তিন-চারটে গান বন্ধ করে দিয়েছিল তবুও তিনি থেমে থাকেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন গান ভালো হলে, তা নিজের জায়গা করে নেবে।
বহু বিতর্ক, রক্ষণশীলতার বেড়াজাল ও সমালোচনার পরও, আশা ভোঁসলের কণ্ঠস্বরই হয়ে উঠেছিল বলিউডের সাহসী গানের প্রতীক। গানের সাহসী কথা বা মেজাজ যাই থাক, তার কণ্ঠই গানগুলোকে চিরকালীন করে তুলেছে।
সত্যি বলতে আশার জীবনে একরাশ আলো নিয়ে এসেছিলেন রাহুলদেব বর্মন। আর রাহুলের যাবতীয় এক্সপেরিমেন্টকে সফল করতে সর্বদাই যেন তৈরি ছিলেন আশা। তারা দুজনে যেন ছিলেন গানের ভুবনে সুরের পাখি। ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘মেরা কুছ সামান’-এর মতো হিন্দি গানের পাশাপাশি ‘মহুয়া জমেছে আজ’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘চোখে নামে বৃষ্টি’র মতো বহু বাংলা গান সঙ্গীতপ্রেমীদের উপহার দিয়েছিলেন রাহুল-আশা জুটি।
মুজফ্ফর আলির ছবি ‘উমরাও জান’-এ আশা কণ্ঠ দিলেন গজলে। খৈয়ামের সুরে ‘ইন আখোঁ কি মস্তি’, ‘দিল চিজ় ক্যা হ্যায়’। রাহুলের সুরে গুলজারের ‘ইজ়াজ়ত’-এ ‘মেরা কুছ সামান’ জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার। ২০০১ সালে এসে এ আর রহমানের সুরেই ‘লগান’ ছবিতে ‘রাধা ক্যায়সে না জ্বলে’ বা ‘প্যার তু নে ক্যা কিয়া’ (২০০৪)-এ ‘কমবখ্ত ইশক’ গেয়ে মাতিয়ে রেখেছেন গোটা দেশকে।

এক বোন যদি লতা মঙ্গেশকর হন, তা হলে অন্য বোনকে আশা ভোসলে হয়ে উঠতে গেলে, কতটা কঠিন পথ পেরোতে হয়, তা যিনি সে পথে হেঁটেছেন, তিনিই বলতে পারবেন
আশার ক্যারিয়ারের ঝুলিতে ছিল ১২ হাজারেরও বেশি গান। সঙ্গীতে অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে পেয়েছিলেন পদ্মভূষণ। তা ছাড়া, ১৯৯৭ সালে গ্র্যামির জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। আশার পেশাগত জীবন সাফল্যের আলোয় যতটা রঙিন, ব্যক্তিজীবন ছিল ততোধিক আঁধারময়। আশা মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন তার ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোসলেকে। দু’জনের বয়সের পার্থক্য ছিল ২০ বছরের। গণপতরাওয়ের সঙ্গে আশার সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি আশার পরিবার। অন্যদিকে স্বামী গণপতরাও এবং তার পরিবারের কাছ থেকেও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন আশা। নিজের পরিবারের সঙ্গেও তার তৈরি হয়েছিল দীর্ঘদিনের দিনের দূরত্ব। প্রিয় বড় বোন লতা মঙ্গেশকারও দীর্ঘদিন কথা বলেননি আশার সঙ্গে।
অন্যদিকে, পরিবারে এক বোন যদি লতা মঙ্গেশকর হন, তা হলে অন্য বোনকে আশা ভোসলে হয়ে উঠতে গেলে, কতটা কঠিন পথ পেরোতে হয়, তা যিনি সে পথে হেঁটেছেন, তিনিই বলতে পারবেন। নিজের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের কথা বলতে হলে সঠিক গানটি হলো, ‘জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় প্যাহেলি হায় কাভি তো হাসায়, কাভি ইয়ে রুলায়’— এই জায়গায় পৌঁছাতে আমাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে।’
সেই সাক্ষাৎকারে আফসোস করে আশা বলেছিলেন, ‘আমি এই ইন্ডাস্ট্রির শেষ মোগল। আমার সামনে সবাই এক এক করে চলে গেছেন। আমি একা রয়ে গেছি।’
সঙ্গীত ইন্ডাস্ট্রির শেষ মোগলেরও শ্বাসপ্রশ্বাস থেমে গেল আজ রোববার (১২ এপ্রিল)। আর কখনও গেয়ে উঠবে না সুরের পাখি। ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে টানা তিন ঘণ্টা পারফর্ম করেছিলেন তিনি। তার কাছে সঙ্গীতই ছিল শ্বাসগ্রহণ করার সমতুল্য। সঙ্গীতচর্চার মধ্যে নিজের যাপনের সন্ধান পেতেন বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে। আশার মৃত্যুতে সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে বিষাদের সুরে বেজে উঠছে ‘আভি না যাও ছোড় কর, কে দিল আভি ভরা নেহিঁ’…
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, প্রথম আলো
লেখক: নিউজরুম এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট