নতুন বছর— শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়, মানুষের আশা, প্রত্যাশা আর নতুন শুরুর প্রতীক। তবে পৃথিবীর সব দেশে নতুন বছর উদযাপনের রীতি এক নয়। কোথাও তা আনন্দ-উল্লাসে মুখর, কোথাও আবার বেশ মজার ও ব্যতিক্রমী। আতশবাজি, গান-নাচের বাইরে গিয়ে অনেক দেশেই আছে এমন সব রীতি, যা শুনলে অবাক হতে হয়, আবার হাসিও পায়। চলুন ঘুরে আসি বিশ্বজুড়ে—দেখি কোথায় কিভাবে ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র: টাইমস স্কয়ারের বল ড্রপ
নিউ ইয়ারের কথা বললেই চোখে ভাসে নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার। ৩১ ডিসেম্বর রাত ঠিক ১১টা ৫৯ মিনিটে বিশাল ঝকঝকে বলটি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করে, আর শূন্য ছুঁলেই শুরু হয় নতুন বছর। লক্ষ মানুষ সরাসরি উপস্থিত থাকে, কোটি মানুষ দেখে টিভি পর্দায়। চুম্বন, কনফেটি, আতশবাজি আর ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। যুক্তরাষ্ট্রে এদিন ‘নিউ ইয়ার রেজোলিউশন’ নেওয়ার রীতিও বেশ জনপ্রিয়—ওজন কমানো থেকে শুরু করে জীবনের নতুন লক্ষ্য ঠিক করা।
কানাডা: বরফ ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ
কানাডায় নতুন বছর মানেই ঠান্ডা চ্যালেঞ্জ! ‘পোলার বেয়ার প্লাঞ্জ’ নামে পরিচিত এই রীতিতে মানুষ বরফশীতল সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়। বিশ্বাস করা হয়, এতে পুরোনো বছরের ক্লান্তি ধুয়ে যায় এবং নতুন বছর শুরু হয় সতেজভাবে। কেউ আবার মজার পোশাক পরে নামেন পানিতে—দর্শকদের জন্য একেবারে বিনোদন প্যাকেজ।
স্পেন: ১২ সেকেন্ডে ১২টি আঙুর
স্পেনে নতুন বছর মানে আঙুরের পরীক্ষা! রাত ১২টার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ১২ সেকেন্ডে ১২টি আঙুর খেতে হয়। প্রতিটি আঙুর বছরের এক একটি মাসের প্রতীক। যদি কেউ ঠিকঠাক খেতে পারে, তবে বছরজুড়ে সৌভাগ্য থাকবে—এমনটাই বিশ্বাস। টিভিতে সরাসরি ঘণ্টাধ্বনি সম্প্রচার হয়, আর গোটা দেশ একসঙ্গে আঙুর খেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জাপান: ঘন্টা বাজে ১০৮ বার
জাপানে নতুন বছর অত্যন্ত আধ্যাত্মিক ও শান্তভাবে পালিত হয়। বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে ১০৮ বার ঘণ্টা বাজানো হয়, যাকে বলা হয় ‘জোয়া নো কানে’। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের ১০৮টি কামনা-বাসনা বা পাপ রয়েছে—এই ঘণ্টাধ্বনি সেগুলো থেকে মুক্তির প্রতীক। পরিবারগুলো ঘর পরিষ্কার করে, বিশেষ খাবার ‘ওসেচি রিওরি’ খায় এবং একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়।
ব্রাজিল: সাদা পোশাক আর সমুদ্রের ঢেউ
ব্রাজিলে নতুন বছর মানেই সাদা পোশাক। শান্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে সবাই সাদা রঙ পরেন। রিও ডি জেনেইরোর সমুদ্রসৈকতে লাখো মানুষ জড়ো হয়। অনেকেই সাতটি ঢেউয়ের ওপর লাফ দেয়—প্রতিটি লাফ একেকটি শুভকামনার প্রতীক। আবার কেউ সমুদ্রে ফুল ভাসিয়ে দেন সৌভাগ্যের দেবীর উদ্দেশ্যে।
চীন: যদিও জানুয়ারি নয়, তবু আলাদা প্রস্তুতি
চীনে জানুয়ারি ১ তারিখ নতুন বছর হিসেবে খুব বড়ভাবে পালিত না হলেও গ্রেগরিয়ান নিউ ইয়ারে আধুনিক শহরগুলোতে আতশবাজি হয়। তবে আসল উৎসব হয় চন্দ্র নববর্ষে। তবুও নতুন বছরের প্রথম দিনে পরিবার নিয়ে খাবার খাওয়া, পুরোনো ঝামেলা ভুলে যাওয়ার রীতি দেখা যায়।
ফ্রান্স: চুম্বন আর শ্যাম্পেন
ফ্রান্সে নতুন বছর মানে ভালোবাসার উৎসব। রাত ১২টায় প্রিয়জনকে চুম্বন করা সৌভাগ্যের প্রতীক। শ্যাম্পেন তো থাকবেই। অনেকেই বিশ্বাস করেন, নতুন বছরের প্রথম মুহূর্তে হাসিমুখে থাকলে পুরো বছর ভালো কাটে।
কলম্বিয়া: হলুদ অন্তর্বাসের রহস্য
কলম্বিয়ায় নতুন বছরের জন্য কেনাকাটার তালিকায় একটি বিশেষ জিনিস থাকে—হলুদ অন্তর্বাস! বিশ্বাস করা হয়, এটি সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি বয়ে আনে। কেউ কেউ আবার স্যুটকেস নিয়ে ঘোরাফেরা করেন— নতুন বছরে ভ্রমণের আশায়।
জার্মানি: সীসা গলিয়ে ভবিষ্যৎ দেখা
জার্মানিতে ‘ব্লাইগিসেন’ নামে একটি মজার রীতি আছে। গলিত সীসা পানিতে ফেলে যে আকার তৈরি হয়, তা দেখে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা হয়। যদিও পরিবেশগত কারণে এখন এটি কমে এসেছে, তবু ঐতিহ্যটি এখনো গল্পে বেঁচে আছে।
ডেনমার্ক: প্লেট ভাঙার উৎসব
ডেনমার্কে নতুন বছর মানে প্রতিবেশীর দরজায় প্লেট ছোড়া! যত বেশি ভাঙা প্লেট, তত বেশি বন্ধু— এমন বিশ্বাস প্রচলিত। বছরের শেষ রাতে পুরোনো থালা-বাসন ভেঙে ফেলা হয়, আর নতুন বছরে নতুন শুরু করা হয়।
বাংলাদেশ: আতশবাজির আলোয় নতুন স্বপ্ন
বাংলাদেশে জানুয়ারি ১ মূলত শহরকেন্দ্রিক উদযাপন। বন্ধুদের আড্ডা, কেক কাটা, আতশবাজি আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়—এই নিয়েই দিনটি কাটে। অনেকের কাছে এটি নতুন পরিকল্পনা ও আশার সূচনা।
শেষ কথা
ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ভিন্ন হলেও নতুন বছর নিয়ে মানুষের চাওয়া-পাওয়া প্রায় এক—ভালো থাকা, শান্তি আর সুখ। কেউ আঙুর খায়, কেউ বরফ পানিতে ঝাঁপ দেয়, কেউ প্লেট ভাঙে—কিন্তু সবার অন্তরের কামনা একটাই: আসুক একটি সুন্দর নতুন বছর।