Monday 05 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

২০২৫: বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের এক সন্ধিক্ষণ

ভূঁইয়া মোহাম্মদ ইমরাদ (তুষার)
৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৯

২০২৫ সাল বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ছিল পরিবর্তন, পুনর্বিন্যাস ও নতুন সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্মার্ট নাগরিক সেবায় বিগত বছরে একাধিক দৃশ্যমান অগ্রগতি দেশের ডিজিটাল রূপান্তর অভিযাত্রাকে নতুন গতি দিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালকে বলা যায় বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের পথে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো আইসিটি খাতের উল্লেখযোগ্য ঘটনা, নীতিগত অগ্রগতি ও প্রবণতার একটি সংক্ষিপ্ত সালতামামি।

ডিজিটাল রূপান্তর বাস্তবায়নে নতুন গতি

বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালে ডিজিটাল রূপান্তর রূপকল্প বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগ আরও দৃশ্যমান হয়। স্মার্ট গভর্ন্যান্স, স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট সিটিজেন ও স্মার্ট সোসাইটি এই চার স্তম্ভকে কেন্দ্র করে আইসিটি অবকাঠামো ও সেবায় একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণে জোর দেয়া হয়। সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে ডেটা শেয়ারিং ও আন্তঃসংযোগ বাড়াতে ই-গভর্ন্যান্স প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত করা হয়।

ই-গভর্ন্যান্স ও নাগরিক সেবার ডিজিটালায়ন

নাগরিক সেবায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, কর প্রদান এবং লাইসেন্সিং সেবায় অনলাইন আবেদন ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে। এতে সেবাপ্রাপ্তিতে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি স্বচ্ছতাও বেড়েছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের ডিজিটাল সেন্টারগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ডিজিটাল সেবায় প্রবেশ সহজ করেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির উত্থান

২০২৫ সালে বাংলাদেশের আইসিটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ওঠে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং ও ডেটা অ্যানালিটিক্স। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও ফিনটেক খাতে এআইভিত্তিক সমাধানের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক উদ্যোগ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এআই ল্যাব, ইনোভেশন হাব এবং প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণার প্রবণতা জোরালো হয়।

স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম: চাপের মধ্যেও সম্ভাবনা

২০২৫ সালে দেশের স্টার্টআপ খাত একদিকে বিনিয়োগ সংকট ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়লেও, অন্যদিকে টিকে থাকার কৌশলে নতুনত্ব দেখিয়েছে। ফিনটেক, হেলথটেক, এডটেক ও লজিস্টিকস খাতে স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে বেশ কিছু স্টার্টআপ আলোচনায় আসে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত ইনকিউবেশন ও অ্যাক্সিলারেশন প্রোগ্রামগুলো উদ্যোক্তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।

আইটি ও আইটিইএস রপ্তানি: বৈচিত্র্যের পথে অগ্রযাত্রা

আইটি ও আইটিইএস রপ্তানিতে ২০২৫ সালে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি গেমিং, অ্যানিমেশন, ভিএফএক্স এবং সাইবার নিরাপত্তা সেবার চাহিদা বাড়তে দেখা যায়। ফ্রিল্যান্সারদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে প্রবেশ এবং বৈদেশিক আয়ের সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

টেলিযোগাযোগ ও ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো

২০২৫ সালে টেলিযোগাযোগ খাতে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকে। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগের মান উন্নয়ন, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক বিস্তার এবং মোবাইল ডেটা সেবার সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ লক্ষ করা যায়। একই সঙ্গে সেবার মান, মূল্য ও ভোক্তা অধিকার নিয়েও আলোচনা জোরদার হয়।

সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষা: বাড়ছে গুরুত্ব

ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ২০২৫ সালে একটি বড় আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। সরকারি ও বেসরকারি খাতে সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নীতিমালার বাস্তবায়নে জোর দেয়া হয়। ডেটা সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে জনআলোচনাও এ বছরে আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে।

দক্ষ মানবসম্পদ ও আইসিটি শিক্ষা

আইসিটি খাতের টেকসই উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির গুরুত্ব ২০২৫ সালে নতুন করে আলোচনায় আসে। কারিকুলাম হালনাগাদ, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং অনলাইন স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎমুখী দক্ষতায় প্রস্তুত করার উদ্যোগ জোরদার হয়।

নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক অগ্রগতি: ২০২৫-এর উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্তসমূহ

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদিত ‘বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ টেলিকম খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। এতে ইন্টারনেট বা টেলিকম সেবা নির্বিচারে বন্ধ করার স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, বিটিআরসি’র স্বায়ত্তশাসন ও দায়বদ্ধতা জোরদার এবং ২০১০ সালের বিতর্কিত কিছু বিধান বাতিল বা সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই অধ্যাদেশ নাগরিকের ডিজিটাল ও সাইবার অধিকারের ভিত্তি শক্ত করেছে।

টেলিকম নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং নীতি ২০২৫

এই নীতির মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন ও জটিল লাইসেন্স কাঠামোকে চারটি প্রধান ক্যাটাগরিতে সংহত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০২৭ সালের মধ্যে নতুন কাঠামোতে রূপান্তরের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, যা লাইসেন্সিং ব্যবস্থাকে আরও সহজ, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।

সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষা আইন

২০২৫ সালে সংশোধিত সাইবার নিরাপত্তা আইন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, ডিজিটাল সম্মতি এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন কাঠামো তৈরি করেছে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা বোর্ড গঠন ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

ইন্টারনেট অ্যাক্সেস: নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতির পথে

২০২৫ সালে সরকার ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে, যা ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্টারলিংক ও এনইআইআর: প্রযুক্তিগত মাইলফলক

২০২৫ সালে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা বাংলাদেশে চালু হয়, যা গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই বছরে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়, যা মোবাইল বাজারে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও রাজস্ব সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

২০২৫ সাল বাংলাদেশের আইসিটি খাতে একদিকে বাস্তব চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা, উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াস অব্যাহত থাকলে ডিজিটাল রূপান্তর বাস্তবায়নে আইসিটি খাত আরও শক্ত ভূমিকা রাখবে এমন প্রত্যাশাই খাত সংশ্লিষ্টদের। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাস্তবতায় ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।

লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, কমপিউটার বিচিত্রা

সারাবাংলা/এনএল/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর