সাধারণত গ্রিনল্যান্ডের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিং নেতা এরিক দ্য রেডের আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হওয়ার গল্প। তিনি এই বরফাবৃত দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন ‘গ্রিনল্যান্ড’ বা সবুজ ভূমি, যা ছিল মূলত অভিবাসীদের আকৃষ্ট করার একটি চতুর কৌশল। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং আধুনিক বিজ্ঞান এক ভিন্ন সত্য উন্মোচন করেছে— এরিক দ্য রেডের আগমনের অন্তত ৩,৫০০ বছর আগেই গ্রিনল্যান্ড ছিল প্রাণচঞ্চল।
প্যালিও-এস্কিমো: প্রতিকূলতার প্রথম কারিগর
গ্রিনল্যান্ডের প্রকৃত প্রাক-ইতিহাস শুরু হয় প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে। নর্সদের অনেক আগে থেকেই সেখানে পর্যায়ক্রমে বসতি গড়েছিল ইন্ডিপেনডেন্স, সাক্কাক এবং ডরসেট সংস্কৃতির ‘প্যালিও-এস্কিমো’ সম্প্রদায়গুলো। এরা কোনো একক জনগোষ্ঠী ছিল না, বরং ছিল ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক ঢেউ।
তাদের টিকে থাকার কৌশল ছিল বিস্ময়কর
প্রযুক্তি: হাড়ের তৈরি সূক্ষ্ম সরঞ্জাম এবং ক্ষুদ্রাকৃতির ব্লেড।
পরিবহন: সামুদ্রিক বরফে চলাচলের উপযোগী চামড়ায় ঢাকা বিশেষ জলযান।
অভিযোজন: জলবায়ুর পরিবর্তন ও হোলোসিন যুগের উষ্ণ-শীতল পর্যায়গুলোর সাথে তাল মিলিয়ে তারা বারবার বসতি স্থাপন করেছে।
নর্স আগমন ও মধ্যযুগীয় প্রেক্ষাপট
যখন এরিক দ্য রেড গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছান, তখন ইউরোপে চলছিল ‘মধ্যযুগীয় উষ্ণ পর্ব’। এই জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের খাঁড়িগুলো ইউরোপীয় পশুপালনের জন্য কিছুটা উপযুক্ত হয়ে ওঠে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন যেমন ‘ব্রাটাহলিড’-এর খননকার্য থেকে জানা যায়, সেখানে এক সময় বিশাল খামার, গির্জা এবং ইউরোপের সাথে সক্রিয় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। তবে এই নর্স বসতিগুলো ছিল গ্রিনল্যান্ডের দীর্ঘ ইতিহাসে একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায় মাত্র।
থুলে ইনুইট: আধুনিক গ্রিনল্যান্ডের পূর্বপুরুষ
নর্সরা যখন তাদের বসতি বিস্তারে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ১৩শ শতাব্দীর দিকে কানাডিয়ান আর্কটিক থেকে গ্রিনল্যান্ডে আগমন ঘটে থুলে জনগোষ্ঠীর। বর্তমানের গ্রিনল্যান্ডিক ইনুইটদের পূর্বপুরুষ ছিলেন তারাই। তারা নিয়ে এসেছিলেন কুকুর-চালিত স্লেজ এবং বড় চামড়ার নৌকার মতো উন্নত প্রযুক্তি, যা তাদের আর্কটিকের কঠোর পরিবেশে নর্সদের চেয়েও বেশি টেকসই করে তুলেছিল।
এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
রেডিওকার্বন ডেটিং এবং জেনেটিক বিশ্লেষণ আজ প্রমাণ করেছে যে, গ্রিনল্যান্ড কখনোই কোনো ‘শূন্য’ বা জনমানবহীন প্রান্তর ছিল না। এরিক দ্য রেড কোনো জনশূন্য ভূখণ্ড ‘আবিষ্কার’ করেননি, বরং তিনি এমন এক আদিবাসী জনপদে প্রবেশ করেছিলেন যাদের ছিল গভীর ইতিহাস এবং উন্নত বাস্তুসংস্থানিক জ্ঞান।
গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস তাই কেবল বিজয় বা আবিষ্কারের গল্প নয়; এটি আদিবাসীদের উদ্ভাবনী শক্তি এবং কয়েক হাজার বছর ধরে প্রকৃতির সাথে মানুষের মিতালির এক জীবন্ত দলিল।
(উৎস: ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং প্যালিও-এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজ)