Sunday 01 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:১৯

১৯৩০ সালের জুলাই মাস। আটলান্টিক মহাসাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে একদল স্বপ্নবাজ ফুটবলার যখন উরুগুয়ের মন্টেভিডিও বন্দরে পা রাখলেন, তখন তারা কল্পনাও করতে পারেননি যে তারা এক মহাকাব্যিক ইতিহাসের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। ফুটবল তখন কেবল একটি খেলার নাম ছিল না, ছিল এক নতুন বিশ্বজয়ের উন্মাদনা। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা আর অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে সেই বছরের ১৩ জুলাই যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন। ফিফা বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চকর শুরুর গল্পটি ছিল নাটকীয়তা আর সাহসিকতায় ঘেরা।

উরুগুয়েতে কেন প্রথম আসর?

বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজক হওয়ার দৌড়ে ছিল অনেকগুলো ইউরোপীয় দেশ। কিন্তু ফিফা বেছে নিয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দেশ উরুগুয়েকে। এর পেছনে কারণ ছিল মূলত দুটি। প্রথমত, উরুগুয়ে ছিল তৎকালীন ফুটবলের রাজা— যারা ১৯২৪ এবং ১৯২৮ সালের অলিম্পিক ফুটবলে সোনা জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল। দ্বিতীয়ত, ১৯৩০ সাল ছিল উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবর্ষ। নিজেদের স্বাধীনতার আনন্দকে ফুটবলীয় উৎসবে রাঙাতে উরুগুয়ে সরকার সে সময় স্টেডিয়াম নির্মাণ থেকে শুরু করে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর যাতায়াত খরচ বহনেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপের অনীহা ও দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা

আজকের দিনে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া মানেই যেখানে বিলাসবহুল চার্টার্ড ফ্লাইট, তখন চিত্রটা ছিল একদম ভিন্ন। ইউরোপের অনেক দেশ উরুগুয়ে পর্যন্ত লম্বা দূরত্ব এবং যাতায়াতের পাহাড়সম খরচ দেখে পিছুটান দেয়। মাত্র চারটি ইউরোপীয় দেশ—ফ্রান্স, যুগোস্লাভিয়া, রোমানিয়া এবং বেলজিয়াম এই দুঃসাহসিক অভিযানে রাজি হয়। তারা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বিশাল এক জাহাজে চড়ে আটলান্টিক পাড়ি দেয়। সেই জাহাজে খেলোয়াড়দের সাথে ছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে এবং খোদ বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি। জাহাজের ডেকেই চলত ফুটবলারদের শারীরিক কসরত আর পিংপং খেলা।

বিশ্বকাপে প্রথম গোল ও ঐতিহাসিক সেই মুহূর্ত

১৩ জুলাই, ১৯৩০। প্রবল শীতের বিকেল। তুষারপাতের ঝাপটায় মন্টেভিডিওর আকাশ কিছুটা ধূসর। একই সাথে শুরু হলো ইতিহাসের প্রথম দুটি ম্যাচ। পসিতোস স্টেডিয়ামে মুখোমুখি ফ্রান্স ও মেক্সিকো, আর অন্য মাঠে যুক্তরাষ্ট্র লড়ছিল বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ইতিহাসের অমর পাতায় নাম লেখালেন ফ্রান্সের লুসিয়েন লরেন্ট। ম্যাচের ১৯ মিনিটে মেক্সিকোর জালে বল পাঠিয়ে তিনি হয়ে গেলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা। ফ্রান্স ম্যাচটি ৪-১ গোলে জিতে নেয়। লরেন্ট পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তখন তিনি বুঝতেই পারেননি তার এই গোলটি এক দিন ইতিহাসের কত বড় মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে।

বল নিয়ে বিচিত্র লড়াই ও ফাইনালের রোমাঞ্চ

বিশ্বকাপের সেই প্রথম আসরের ফাইনাল ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার লড়াই। ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে প্রায় ৯৩ হাজার দর্শক মাঠে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ফাইনালের আগেই শুরু হলো এক অদ্ভুত বিতর্ক, কোন দেশের বল দিয়ে খেলা হবে? দুই দলই নিজেদের দেশের তৈরি বল দিয়ে খেলতে অনড়। শেষ পর্যন্ত ফিফা এক যুগান্তকারী সমাধান দেয়। প্রথমার্ধ খেলা হয় আর্জেন্টিনার বল দিয়ে এবং দ্বিতীয়ার্ধ উরুগুয়ের বল দিয়ে। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও, দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের পছন্দের বল পেয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে উরুগুয়ে। শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্বাগতিকরা।

অবিশ্বাস্য সব রেকর্ড ও প্রাপ্তি

প্রথম বিশ্বকাপের নায়ক ছিলেন আর্জেন্টিনার গুইলারমো স্টাবিল। তিনি পুরো টুর্নামেন্টে ৮টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মান পান। মজার ব্যাপার হলো, তিনি শুরুর একাদশে ছিলেন না, সুযোগ পেয়েছিলেন অন্য এক খেলোয়াড়ের অসুস্থতার কারণে। উরুগুয়ের এই জয় এতটাই আবেগের ছিল যে, ফাইনালের পরদিন দেশটিতে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়। মাত্র ১৩টি দল নিয়ে শুরু হওয়া সেই টুর্নামেন্ট আজ ৩২ থেকে ৪৮ দলের মহাযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। অথচ এই সবকিছুর মূলে ছিল সেই ১৯৩০ সালের এক পাক্ষিক লড়াই আর ফুটবলারদের অদম্য জেদ। বিশ্বকাপের সেই প্রথম আসরটি প্রমাণ করেছিল যে, গোলকধাঁধায় ঘেরা এই খেলাটি এক দিন মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বকে এক সুতোয় বাঁধবে।

(সূত্র: ফিফা আর্কাইভ, হিস্টোরি অফ ওয়ার্ল্ড কাপ এবং ব্রেকিংনিউজ ডট কম ডট বিডি)

বিজ্ঞাপন

১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সব ব্যাংক বন্ধ
১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:১৯

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর