শিশুসাহিত্যের পাতায় যারা ‘সোয়ালোস অ্যান্ড অ্যামাজনস’ পড়ে বড় হয়েছেন, তাদের কাছে আর্থার র্যানসাম মানেই এক শান্ত লেক ডিস্ট্রিক্ট আর পাল তোলা নৌকার শৈশব। কিন্তু ইতিহাসের ধুলোবালি ঝাড়লে বেরিয়ে আসে এক অন্য মানুষ, যিনি এক হাতে শিশুদের জন্য রূপকথা লিখছিলেন, আর অন্য হাতে পকেটে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বলশেভিক বিপ্লবের হীরা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গোপন নথি। এটি কেবল একজন লেখকের জীবনী নয়, বরং বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ এক ছদ্মবেশী গোয়েন্দার রোমাঞ্চকর উপাখ্যান।
১৯১৭ সালের উত্তাল রাশিয়া। যে সময়টা ছিল লেনিন ও ট্রটস্কির উত্থানের কাল, সেই সময়ে একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক হিসেবে র্যানসামের উপস্থিতি ছিল অনেকটা ঝড়ের কেন্দ্রে শান্ত দাঁড়িয়ে থাকা এক নাবিকের মতো। পশ্চিমা বিশ্ব যখন বলশেভিকদের ‘দানব’ হিসেবে দেখছিল, র্যানসাম তখন ক্রেমলিনের অন্দরমহলে লেনিনের সাথে দাবার গুটি চালছিলেন। তার এই ঘনিষ্ঠতা কোনো কাকতালীয় বিষয় ছিল না। রুশ ভাষায় তার সাবলীল দখল এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা তাকে বলশেভিক নেতাদের সবচেয়ে কাছের মানুষে পরিণত করেছিল।
তবে গল্পের প্রকৃত বাঁক শুরু হয় যখন র্যানসামের ব্যক্তিগত জীবন এবং গোয়েন্দা জীবন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ট্রটস্কির ব্যক্তিগত সচিব ইভজেনিয়া শেপিনার সাথে তার প্রেম কেবল আবেগের ছিল না, এটি ছিল তার তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6-এর নথিতে তার নাম নথিভুক্ত হয় ‘S.76’ কোড নামে। তিনি ছিলেন ইতিহাসের সেই বিরল চরিত্রদের একজন, যারা একই সাথে দুই নৌকায় পা দিয়ে কেবল টিকে থাকেননি, বরং ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছেন। তিনি একদিকে ব্রিটিশদের কাছে রাশিয়ার খবর পাঠাতেন, অন্যদিকে লেনিনের হয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্তে হীরা পাচার করতেন। মজার ব্যাপার হলো, ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাকে বিমানবন্দরে আটকানোর পর যখন তার পকেটে হীরা ও মুক্তো পেতেন, তখনও তারা তাকে গ্রেফতার করতে দ্বিধায় থাকতেন— কারণ তিনি ছিলেন তাদের সবচেয়ে বড় তথ্যের ভাণ্ডার।
র্যানসামের এই দ্বৈত জীবন নিয়ে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বা কমেডি হলো তার ইংল্যান্ডে ফিরে আসা। ১৯১৯ সালে যখন তিনি ইভজেনিয়াকে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন, তখন পরিস্থিতি ছিল জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে। বলশেভিক সৈন্যরা তাকে সীমান্ত আটকে দিলেও শেষ রক্ষা হয় লেনিনের সই করা একটি বিশেষ পাসের কারণে। আবার যখন তিনি ইংল্যান্ডে পৌঁছান, ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাকে কয়েক মাস ধরে জেরা করেও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি যে, র্যানসাম আসলে কার লোক? তিনি কি ব্রিটিশ এজেন্ট নাকি বলশেভিকদের ছদ্মবেশী চর? এই রহস্যের জট তার জীবদ্দশায় কোনোদিনই খোলেনি।
ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্টে যখন তিনি নিভৃতবাস শুরু করেন এবং ছোটদের জন্য কালজয়ী সব বই লিখতে শুরু করেন, তখনও তার ওপর গোয়েন্দা নজরদারি কমেনি। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এবং এমআই-ফাইভের কর্তারা দিনের পর দিন তার গল্পের পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করতেন এই ভয়ে যে, হয়তো শিশুদের নৌকার লড়াইয়ের বর্ণনার আড়ালে লুকিয়ে আছে সোভিয়েত রাশিয়ার কোনো গোপন সামরিক কোড। যে মানুষটি একসময় হীরা পাচার করতেন এবং লেনিন-ট্রটস্কির ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকতেন, তাকেই পরবর্তী জীবনে লড়তে হয়েছে সাধারণ এক শিশুসাহিত্যিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার লড়াইয়ে।
আর্থার র্যানসামের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্য অনেক সময় কল্পকাহিনীর চেয়েও অনেক বেশি জটিল এবং রোমাঞ্চকর। ১৯৯৯ সালে যখন ব্রিটিশ আর্কাইভ থেকে তার গোপন ফাইলগুলো উন্মোচিত হলো, তখন বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে দেখল যে, একজন ‘আসল জেমস বন্ড’ আসলে কলম দিয়ে নয়, তার ব্যক্তিত্ব আর সাহস দিয়ে একাই বদলে দিয়েছিলেন বিশ্ব রাজনীতির অনেক সমীকরণ। আজ তার সেই শান্ত ডায়েরি বা শিশুদের বইগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, প্রতিটি লাইনের আড়ালে হয়তো এখনও মুচকি হাসছেন সেই রহস্যময় ব্রিটিশ সাংবাদিক, যার আসল পরিচয় আজও ইতিহাসের ধোঁয়াশায় ঘেরা।
(সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান আর্কাইভস, ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভস ফাইল নং- KV 2/1903, এবং রোল্যান্ড চেম্বারস রচিত ‘দ্য লাস্ট ইংলিশম্যান: দ্য ডাবল লাইফ অফ আর্থার র্যানসাম’)