ইতিহাসের পাতা ওল্টালে ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসটি মানব সভ্যতার এক কালো অধ্যায় হিসেবে ভেসে ওঠে। যুদ্ধের উন্মাদনায় মানুষ কতটা নৃশংস হতে পারে, তার সাক্ষী হয়ে আছে হিরোশিমা ও নাগাসাকি। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই জন্ম নিয়েছিল এক অবাস্তব আর অলৌকিক গল্প। গল্পের নায়ক – সুতোমু ইয়ামাগুচি। যিনি যমরাজের দুয়ারে কড়া নেড়েও দুইবার ফিরে এসেছিলেন।
হিরোশিমার সেই অভিশপ্ত সকাল
৬ আগস্ট, ১৯৪৫। পেশায় ন্যাভাল ইঞ্জিনিয়ার ২৯ বছর বয়সী ইয়ামাগুচি সেদিন হিরোশিমায় তার তিন মাসের ব্যবসায়িক সফর শেষ করে বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে আকাশ থেকে যখন ‘লিটল বয়’ নেমে আসে, তিনি গ্রাউন্ড জিরো থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে শহরটি এক আগুনের কুণ্ডলীতে পরিণত হয়। ইয়ামাগুচি দেখেছিলেন আলোর এক তীব্র ঝলকানি, যা সূর্যের চেয়েও প্রখর। বিস্ফোরণের ধাক্কায় তিনি ছিটকে পড়েন, কানে পর্দা ফেটে যায় এবং শরীরের একাংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। কিন্তু মৃত্যু তাকে ছুঁতে পারেনি। সেই ধ্বংসলীলার মাঝেই তিনি রাত কাটান এবং পরদিন কোনোমতে ট্রেনের ব্যবস্থা করে নিজের শহর নাগাসাকির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
ভাগ্য যখন ফের মৃত্যুর মুখোমুখি
৯ আগস্ট, নাগাসাকি। শরীরে ব্যান্ডেজ নিয়ে ইয়ামাগুচি যখন তার অফিসের বসকে হিরোশিমার সেই অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলছিলেন, তখন তার বস বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ আকাশ কাঁপিয়ে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ ঘটে। নাগাসাকিতে ফেলা হয় ‘ফ্যাট ম্যান’। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ইয়ামাগুচি এবারও গ্রাউন্ড জিরো থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটারের মধ্যেই ছিলেন। যে মানুষটি তিন দিন আগে একটি পারমাণবিক বোমা থেকে বেঁচে ফিরেছেন, তিনি আবারও সেই একই পরিস্থিতির শিকার হলেন। পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেলেও ইয়ামাগুচি এবারও বেঁচে যান, যদিও তার শরীরের ক্ষত আরও গভীর হয়।
‘নিজু হিবাকুশা’: ইতিহাসের একমাত্র স্বীকৃতি
জাপানি ভাষায় ‘হিবাকুশা’ মানে হলো বোমা বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি। কিন্তু ইয়ামাগুচি ছিলেন অনন্য। ২০০৯ সালে জাপান সরকার তাকে দাপ্তরিকভাবে ‘নিজু হিবাকুশা’ বা ‘দুইবার বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যাকে দুটি পারমাণবিক বোমার কবলে পড়েও বেঁচে থাকার আনুষ্ঠানিক সনদ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞানের বিস্ময় ও দীর্ঘ জীবন
পারমাণবিক বোমার রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয়তা সাধারণত মানুষের শরীরে ক্যান্সার, থাইরয়েড বা নানা জেনেটিক সমস্যার সৃষ্টি করে। কিন্তু ইয়ামাগুচি ছিলেন বিজ্ঞানের কাছে এক জীবন্ত রহস্য। দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন থাকলেও পরবর্তীতে তার শরীরে তেজস্ক্রিয়তার কোনো বড় প্রভাব ধরা পড়েনি। তিনি কেবল সুস্থই হননি, বরং ২০১০ সালে ৯৩ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে স্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেন।
শান্তির দূত হিসেবে পরবর্তী জীবন
ইয়ামাগুচি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন এবং জাতিসংঘের অধিবেশনে বিশ্বশান্তির পক্ষে ভাষণ দিয়েছেন। তিনি বলতেন, ‘আমার এই বেঁচে থাকাটা ভাগ্যের নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে থাকার জন্য।’
(তথ্যসূত্র: Scienspectra – বিজ্ঞানবর্ণালী এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আর্কাইভ)