Saturday 07 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গানকানজিমা: সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা এক কংক্রিটের কঙ্কাল

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪০

সমুদ্রের বুক চিরে জেগে থাকা এক ধূসর কংক্রিটের কঙ্কাল। জাপানের নাগাসাকি উপকূল থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাশিমা দ্বীপ, যা তার অদ্ভুত আকৃতির জন্য বিশ্বজুড়ে ‘গানকানজিমা’ বা ‘যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ’ নামে পরিচিত। এক সময় এই ক্ষুদ্র ভূখণ্ডটি ছিল জাপানের আধুনিকায়ন এবং শিল্প বিপ্লবের এক জীবন্ত প্রতীক। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই কোলাহলপূর্ণ জনপদ আজ পরিণত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এক জনশূন্য ‘ভূতুড়ে’ দ্বীপে।

শিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জাপানে যখন শিল্পায়নের জোয়ার শুরু হয়, তখন মিৎসুবিশি কর্পোরেশন ১৮৯০ সালে এই দ্বীপটি কিনে নেয়। উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রের তলদেশ থেকে উচ্চমানের কয়লা উত্তোলন। জাপানের দ্রুতগতিতে বেড়ে চলা কলকারখানা আর যুদ্ধজাহাজের জ্বালানি জোগাতে এই দ্বীপটি হয়ে ওঠে দেশটির অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। মাত্র ১৬ একর আয়তনের এই ক্ষুদ্র দ্বীপে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশাল সব আবাসন প্রকল্প।

বিজ্ঞাপন

ঘনবসতির এক অনন্য রেকর্ড

গানকানজিমা এক সময় এতটাই জনবহুল ছিল যে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার তকমা পেয়েছিল। ১৯৫৯ সালে এখানে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৮৩৫ জন মানুষ বাস করত। শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের জন্য এখানে গড়ে তোলা হয়েছিল আকাশচুম্বী অ্যাপার্টমেন্ট, স্কুল, হাসপাতাল, সিনেমা হল এবং জিমনেসিয়াম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দ্বীপে কোনো গাছপালা বা বাগান ছিল না; চারদিকে ছিল শুধু কংক্রিট আর লোহা। সমুদ্রের রুদ্ররূপ থেকে দ্বীপটিকে রক্ষা করতে চারপাশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল উঁচু পাঁচিল, যা দূর থেকে দ্বীপটিকে একটি রণতরীর রূপ দিয়েছিল।

হঠাৎ নেমে আসা নীরবতা

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে জাপানের শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করার পর, সত্তরের দশকে বিশ্বজুড়ে কয়লার চাহিদা কমতে থাকে এবং পেট্রোলিয়াম কয়লার স্থান দখল করে নেয়। ১৯৭৪ সালে মিৎসুবিশি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে খনিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বীপটি সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে। মানুষ তাদের ব্যবহৃত আসবাবপত্র, ঘরোয়া জিনিসপত্র এমনকি শিশুদের খেলনা পর্যন্ত ফেলে রেখে দ্রুত দ্বীপ ত্যাগ করে। এক সময়ের প্রাণচঞ্চল শহরটি রাতারাতি একটি ‘মৃত’ জনপদে পরিণত হয়।

বর্তমানের ধ্বংসাবশেষ ও বিশ্ব ঐতিহ্য

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার ফলে নোনা বাতাস এবং সামুদ্রিক ঝড়ে দ্বীপের ভবনগুলো এখন জরাজীর্ণ। চারদিকে ভেঙে পড়া ছাদ আর খসে পড়া দেওয়ালের মাঝে এখন কেবল বাতাসের হাহাকার শোনা যায়। এই নীরব এবং বিষণ্ণ সৌন্দর্যের কারণে ২০১৫ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এটি পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য, যদিও নিরাপত্তার খাতিরে দ্বীপের সব অংশে প্রবেশের অনুমতি নেই। ইতিহাসের উত্থান আর পতনের এক স্তব্ধ সাক্ষী হিসেবে আজও সমুদ্রের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই কংক্রিটের যুদ্ধজাহাজ।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর