ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতায় এমন কিছু মানুষের নাম খোদাই করা থাকে, যাদের বীরত্ব রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। সাধারণ মানুষের ধারণা অনুযায়ী আশি বছর বয়স মানেই বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া এক জীবন। কিন্তু ১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসে ঘটেছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা, যা বীরত্বের সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছিল। স্যামুয়েল হুইটেমোর নামের এক বৃদ্ধ সেদিন একা হাতে একটি ব্রিটিশ ব্রিগেডের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা আজও সামরিক ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত।
একজন যোদ্ধার নেপথ্য জীবন
স্যামুয়েল হুইটেমোর কেবল একজন সাধারণ কৃষক ছিলেন না। তার রক্তে ছিল যুদ্ধের নেশা। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অনেক আগে থেকেই তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সৈনিক। তিনি ব্রিটিশদের হয়ে ‘কিং জর্জস ওয়ার’ এবং ‘ফ্রেঞ্চ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওয়ার’-এ লড়েছিলেন। তার সামরিক অভিজ্ঞতা এবং যুদ্ধের ময়দানে অটল থাকার মানসিকতা তাকে একজন ঝানু লড়াকু হিসেবে গড়ে তুলেছিল। বয়স আশি ছুঁইছুঁই হলেও তার ভেতরে ছিল তরুণদের মতো তেজোদ্দীপ্ত দেশপ্রেম এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা।
অসম সাহসের সেই রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্র লেক্সিংটন এবং কনকর্ডের যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ সেনারা যখন পিছু হটছিল, তখন বৃদ্ধ স্যামুয়েল স্থির থাকতে পারেননি। তার বাড়ির পাশ দিয়ে যখন একদল ব্রিটিশ সেনা যাচ্ছিলেন, তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাদের আক্রমণ করার। তার কাছে ছিল একটি পুরনো মাস্কেট, দুটি পিস্তল এবং তার প্রিয় তলোয়ারটি। রাস্তার পাশের একটি পাথরের দেয়ালের আড়ালে ওত পেতে থাকলেন তিনি। যখন ব্রিটিশ সেনাদলটি তার হাতের নাগালে এলো, তিনি মুহূর্তের মধ্যে তার মাস্কেট দিয়ে একজনকে গুলি করে হত্যা করলেন। এরপর চোখের পলকে দুই হাতে দুটি পিস্তল বের করে আরও দুই ব্রিটিশ সেনাকে ধরাশায়ী করলেন।
মৃত্যুকে জয় করার সেই অলৌকিক মুহূর্ত স্যামুয়েল যখন তার তলোয়ার নিয়ে ব্রিটিশদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তখন তারা সংখ্যায় ছিল অনেক। ক্ষিপ্ত ব্রিটিশ সৈন্যরা তাকে ঘিরে ধরে নির্মমভাবে আক্রমণ শুরু করে। তার চেহারায় সরাসরি একটি গুলি চালানো হয়, যা তার গাল ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়। এখানেই শেষ নয়, অন্তত তেরোবার তাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। শরীরের প্রতিটি অংশ থেকে রক্ত ঝরছিল এবং ব্রিটিশরা তাকে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায়। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। গ্রামবাসীরা যখন তাকে উদ্ধার করতে আসে, তারা অবাক হয়ে দেখে বৃদ্ধ স্যামুয়েল তখনো নিঃশ্বাস নিচ্ছেন এবং নিজের তলোয়ারটি রক্তমাখা অবস্থায় তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিস্ময় এবং শেষ জীবন উদ্ধারকারীরা যখন তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেন, তখন ডাক্তাররা সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে এই শরীর নিয়ে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তার শরীরে কোনো হাড় অক্ষত ছিল না বললেই চলে। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে স্যামুয়েল হুইটেমোর সুস্থ হয়ে ওঠেন। তিনি কেবল কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন নয়, বরং এই ভয়ংকর ঘটনার পর আরও আঠারো বছর বেঁচে ছিলেন। ৯৮ বছর বয়সে যখন তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন, ততদিনে আমেরিকা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অবিনশ্বর প্রতীক স্যামুয়েল হুইটেমোর আজ ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের একজন অফিসিয়াল স্টেট হিরো। তার এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে সাহসের কোনো বয়স হয় না। ইচ্ছাশক্তি যদি হিমালয়ের মতো অটল হয়, তবে মৃত্যুর দুয়ার থেকেও ফিরে আসা সম্ভব। আজও ইতিহাসের পাতায় স্যামুয়েল হুইটেমোর এমন এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত, যিনি আশি বছর বয়সে একাই একটি আস্ত সেনাদলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং বিজয়ী হয়ে ফিরে এসেছিলেন। তার রক্তমাখা সেই তলোয়ারটি আজও ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।