আঠারোশ সত্তর দশকের সাংহাইয়ের ব্যস্ত রাজপথ। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক ব্যক্তি যার ঘাড়ে চেপে আছে বিশালাকার এক কাঠের তক্তা। এটি কোনো সাধারণ ভার নয়, বরং তৎকালীন চীনের সাম্রাজ্যিক বিচার ব্যবস্থার এক জীবন্ত প্রতীক ‘কাঙু’। পশ্চিমা আলোকচিত্রীদের লেন্সে ধরা পড়া এই দৃশ্যগুলো কেবল অপরাধের শাস্তি নয়, বরং একটি প্রাচীন সভ্যতার সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার কঠোর পদ্ধতির সাক্ষ্য বহন করে। এই যন্ত্রটি যেমন ছিল শারীরিক যন্ত্রণার কারণ, তেমনি ছিল জনসমক্ষে সামাজিক মর্যাদাহানির চরম বহিঃপ্রকাশ।
কাঙুর গঠন ও যন্ত্রণার স্বরূপ
কাঙু মূলত একটি ভারি কাঠের কলার বা জোয়াল, যা অপরাধীর গলার চারপাশে আটকে দেওয়া হতো। এর ওজন এবং আকার এতটাই অসংগতিপূর্ণ ছিল যে, এটি পরিহিত ব্যক্তি নিজের হাতে মুখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারতেন না। ফলে খাবার গ্রহণ বা সামান্য পানীয় পানের জন্য তাকে অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করতে হতো। এই যন্ত্রের গায়ে অপরাধীর নাম, তার কৃতকর্ম এবং শাস্তির মেয়াদ স্পষ্টভাবে লিখে রাখা হতো। এটি কেবল একটি বন্দিদশা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ভ্রাম্যমাণ কারাগার, যা অপরাধীকে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলত।
কনফুসীয় আদর্শ ও লজ্জার সংস্কৃতি
চীনে কাঙু ব্যবহারের মূলে ছিল কনফুসীয় দর্শনের গভীর প্রভাব। এই দর্শনে সামাজিক মর্যাদা এবং পরিবারের সম্মানকে জীবনের সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হতো। কাঙু ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীকে কেবল শারীরিক কষ্ট দেওয়া নয়, বরং তাকে জনসমক্ষে লজ্জিত করা। যখন একজন ব্যক্তি রাস্তার মোড়ে এই কাঠের জোয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তখন তার পরিবারের সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যেত। এই ‘লজ্জার সংস্কৃতি’ সমাজের অন্যান্য মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করত যাতে তারা নিয়ম ভাঙার সাহস না দেখায়। এটি ছিল এমন এক ব্যবস্থা যেখানে সমাজই বিচারকের ভূমিকা পালন করত।
ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও কাঙু নামের উৎস
চৌধশ শতক থেকেই চীন ভ্রমণে আসা বিদেশি পর্যটকদের কাছে এই পদ্ধতিটি ছিল কৌতূহলের বিষয়। মজার বিষয় হলো, কাঙু শব্দটি চীনা শব্দ নয়। এটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘ক্যারকান’ থেকে, যার অর্থ কলার বা বেড়ি। পর্তুগিজ ও ফরাসি পর্যটকরা যখন প্রথম এই যন্ত্রটি দেখেন, তখন তারা তাদের নিজস্ব ভাষার সাথে মিল রেখে এর নামকরণ করেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন সাংহাই বা বেইজিংয়ের বন্দরে পশ্চিমা বাণিজ্যিক আধিপত্য বাড়তে শুরু করে, তখন আলোকচিত্রীরা এই দৃশ্যগুলো ক্যামেরাবন্দী করেন। তাদের কাছে এটি ছিল এক অদ্ভুত এবং কিছুটা বর্বরোচিত প্রথা, যা প্রাচ্যের রহস্যময় আইনি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইউরোপের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো।
আধুনিকতার ছোঁয়া ও আইনি সংস্কারের পথে চীন
চিং রাজবংশের শেষ দিকে চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক চাপের মুখে বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে চীন যখন নিজেকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়, তখন এই প্রথাটি বিলুপ্তির দাবি ওঠে। ১৯০৫ সালের দিকে চিং সরকার আইনি সংস্কারের মাধ্যমে কাঙুর মতো অমানবিক এবং মান্ধাতা আমলের শাস্তির পদ্ধতিগুলো নিষিদ্ধ করতে শুরু করে। এটি ছিল চীনের মধ্যযুগীয় বিচার ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক আইনি কাঠামোর দিকে পা বাড়ানোর প্রথম পদক্ষেপ। আজ সেই কাঙু কেবল ইতিহাসের পাতায় বা জাদুঘরের দেয়ালে বন্দি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক সময়ের কঠোর সামাজিক অনুশাসনের কথা।