মিশরের দেইর-আল-বাহারি সমাধিক্ষেত্রে ১৯৩৫ সালে যখন প্রথম এই মমিটি আবিষ্কৃত হয়, তখন প্রত্নতাত্ত্বিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। সাধারণ মমিগুলোতে যেখানে মৃত্যুর পরবর্তী প্রশান্তি ফুটিয়ে তোলা হয়, সেখানে এই দেহটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মুখটি এমনভাবে হাঁ করা ছিল যেন সহস্র বছর ধরে সে কোনো এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় চিৎকার করে চলেছে। ইতিহাসের পাতায় এই রহস্যময়ী পরিচিতি পায় ‘স্ক্রিমিং মমি’ হিসেবে।
রাজকীয় পরিচয় ও লিনেনের রহস্য
মমিটির শরীরে জড়িয়ে থাকা বহুমূল্য লিনেন কাপড়ে হায়ারোগ্লিফিক লিপিতে লেখা ছিল ‘রাজকন্যা ও রাজ পরিবারের বোন মেরিতামুন’। তবে এই পরিচয়ের সত্যতা নিয়ে দীর্ঘকাল বিতর্ক চলেছে। উন্নত প্রযুক্তির ডিএনএ পরীক্ষা এবং সিউডো-স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে পরবর্তীকালে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, এটি আঠারোতম রাজবংশের উচ্চবংশীয় কোনো এক সদস্যের দেহাবশেষ।
ভয়ের আড়ালে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল যে, হয়তো তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আধুনিক সিটি স্ক্যান রিপোর্টে দেখা যায়, এই নারী হৃদরোগে বা ‘অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস’ নামক ধমনীর জটিলতায় আক্রান্ত ছিলেন। গবেষকদের মতে, প্রচণ্ড হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি মারা যান, তখন সম্ভবত তার চোয়ালের পেশিগুলো সেই যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
সাম্প্রতিক গবেষণায় নয়া তথ্য
সম্প্রতি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিয়োলজিস্ট সাহার সেলিম এবং মিশরীয় পর্যটন ও পুরাকীর্তি মন্ত্রকের নৃতত্ত্ববিদ সামিয়া এল-মেরঘানির গবেষণা এই রহস্যের ওপর নতুন আলোকপাত করেছে। যান্ত্রিক শবব্যবচ্ছেদ পদ্ধতির মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, যন্ত্রণায় তার মুখের পেশি শক্ত হয়ে গিয়েছিল, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্যাডেভারিক স্প্যাজ়ম’ বলা হয়।
সমাধির জমকালো সজ্জা
একটি রাজকীয় ও দামি কাঠের কফিনে এই মমিটি রাখা ছিল। অন্ত্যেষ্টির সময় তাকে অত্যন্ত দামি পোশাক পরানো হয়েছিল। মমির সাথে সোনা ও রুপোর তৈরি দু’টি মূল্যবান আংটি এবং খেজুরের তন্তু থেকে তৈরি একটি চমৎকার লম্বা পরচুলা উদ্ধার করেছেন গবেষকেরা।
রাজকন্যার শারীরিক অবস্থা
রেডিয়োলজির অধ্যাপক সাহার সেলিমের মতে, মৃত্যুর সময় এই মহিলার বয়স ছিল প্রায় ৪৮ বছর। তিনি কেবল হৃদরোগ নয়, বরং মেরুদণ্ডের জটিল সমস্যাতেও ভুগছিলেন। এমনকি মৃত্যুর আগে তিনি তার বেশ কয়েকটি দাঁতও হারিয়েছিলেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সেনমুটের সমাধি ও রাজকীয় যোগসূত্র
মিশরের রানি হাটশেপসুটের রাজস্থপতি ও প্রেমিক সেনমুটের সমাধি খননের সময় এই ‘স্ক্রিমিং মমি’ খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও তার সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে, তবে সমাধিতে পাওয়া দামি গয়না ও রত্ন দেখে গবেষকদের ধারণা, তিনি রাজপরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা উচ্চপদস্থ সদস্য ছিলেন।
বিচিত্র পরচুলা ও প্রসাধন শৈলী
গবেষণায় রাজকন্যার পরচুলার এক বিস্ময়কর বিবরণ পাওয়া গেছে। তার সর্পিল বিনুনিগুলিকে কোয়ার্ৎজ়, ম্যাগনেটাইট এবং অ্যালবাইট খনিজ দিয়ে শক্ত করে কালো রং করা হয়েছিল। তবে তার নিজস্ব প্রাকৃতিক চুলগুলো রাঙানো ছিল জুনিপার তেল দিয়ে, যা প্রাচীন মিশরের উন্নত প্রসাধন শৈলীর পরিচয় দেয়।
মমিকরণের উচ্চমান ও মর্যাদা
সাধারণত কোনো অপরাধীর মমিকরণ অবহেলার সাথে করা হলেও মেরিতামুনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার দেহে দামী সুগন্ধি রজন এবং সিডার কাঠের তেল ব্যবহার করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, তার মৃত্যু যেভাবেই হোক না কেন, তাকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে পরকালের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ইতিহাসের অমীমাংসিত অধ্যায়
আজকের দিনে ‘স্ক্রিমিং মমি’ আর কেবল কোনো ভৌতিক গল্পের খোরাক নয়, বরং এটি প্রাচীন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তার সেই হিমায়িত আকস্মিক যন্ত্রণার মুখভঙ্গি আজও আমাদের তিন হাজার বছর আগের মিশরীয় জীবন ও মৃত্যুর করুণ বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।