Thursday 19 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ওভারটোন ব্রিজ: যেখানে আত্মহত্যা করে কুকুররা!

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৪

স্কটল্যান্ডের পশ্চিম ডানবার্টনশায়ারের শান্ত সবুজ প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা একটি স্থাপত্য নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে চলছে রোমাঞ্চকর আলোচনা। ১৯ শতকে নির্মিত গথিক ধাঁচের এই ‘ওভারটোন ব্রিজ’ আজ আর কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘কুকুরদের আত্মহত্যার সেতু’ হিসেবে। লোককথা আর বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত লড়াইয়ের কেন্দ্রে থাকা এই সেতুটি নিয়ে আজকের এই ফিচার।

রহস্যের শুরু যেখানে

গত কয়েক দশকে ওভারটোন ব্রিজ থেকে কয়েক শ কুকুর নিচে ঝাঁপ দিয়েছে বলে জানা যায়। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, পঞ্চাশের দশক থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কুকুর এই ব্রিজের নির্দিষ্ট একটি অংশ থেকে হঠাত করেই ঝাঁপ দেয়। ৫০ ফুট নিচের পাথুরে জমিতে পড়ে অনেক কুকুর প্রাণ হারিয়েছে, আবার যারা বেঁচে ফিরেছে, অদ্ভুতভাবে তারা আবারও ওই একই জায়গায় গিয়ে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বিষয়টি এতটাই অদ্ভুত যে, ব্রিজের প্রবেশপথে এখন সতর্কবার্তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যাতে মালিকরা তাদের পোষা কুকুরকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন।

বিজ্ঞাপন

হোয়াইট লেডি ও অতিপ্রাকৃত আতঙ্ক

এই রহস্যের সাথে জড়িয়ে আছে ‘ওভারটোন হাউস’-এর এক বিষণ্ণ ইতিহাস। স্থানীয় লোককাহিনী অনুযায়ী, ১৯০৮ সালে লেডি ওভারটোন তার স্বামীর মৃত্যুর পর চরম বিষণ্ণতায় ভুগতেন। শোনা যায়, তার আত্মা বা ‘হোয়াইট লেডি’ এখনো এই ব্রিজের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। অতিপ্রাকৃত তত্ত্বে বিশ্বাসীদের মতে, এই লেডি ওভারটোনের অতৃপ্ত আত্মাই কুকুরদের ওপর এক ধরণের সম্মোহনী প্রভাব বিস্তার করে, যা তাদের নিচে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করে। এছাড়া ১৯৯৪ সালে এক ব্যক্তি তার শিশু সন্তানকে এই ব্রিজ থেকে নিচে ফেলে দিয়ে দাবি করেছিলেন যে সেটি শয়তানের প্ররোচনা ছিল, যা এই ব্রিজের ভুতুড়ে তকমাকে আরও পোক্ত করে।

বিজ্ঞান কী বলছে

তবে গবেষক এবং প্রাণী বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়টিকে অতিপ্রাকৃত বলে মেনে নিতে নারাজ। বিশিষ্ট অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ারিস্ট ডক্টর ডেভিড স্যান্ডস এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন। তার মতে, কুকুররা আসলে আত্মহত্যা করে না, বরং তারা কোনো তীব্র ঘ্রাণের পেছনে ছোটে। তিনি লক্ষ্য করেন যে ব্রিজের নিচে প্রচুর পরিমাণে মিঙ্ক এবং ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর বাস। মিঙ্ক নামক এই প্রাণীর মূত্রের তীব্র গন্ধ কুকুরদের প্রচণ্ডভাবে উত্তেজিত করে তোলে। যেহেতু ব্রিজের দেয়ালগুলো বেশ উঁচু এবং পুরু, তাই কুকুররা নিচ দিয়ে কী আছে তা দেখতে পায় না। কেবল ঘ্রাণের তীব্রতায় উত্তেজিত হয়ে তারা দেয়াল টপকে লাফ দেয়, আর নিচে গভীর খাদ থাকায় তা প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।

আবহাওয়া ও দৃষ্টিশক্তির ভূমিকা

ডক্টর স্যান্ডসের গবেষণায় আরও একটি বিষয় উঠে আসে। তিনি লক্ষ্য করেন যে, কুকুরগুলো সাধারণত রৌদ্রোজ্জ্বল এবং পরিষ্কার আবহাওয়াতেই এই কাজ বেশি করে। পরিষ্কার দিনে মিঙ্কের গায়ের গন্ধ বাতাসে বেশি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া কুকুররা যেহেতু নিচু উচ্চতা থেকে পৃথিবীর দৃশ্য খুব একটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে না এবং তাদের দৃষ্টিসীমার সীমাবদ্ধতা থাকে, তাই তারা বুঝতে পারে না যে দেয়ালের ওপারে সমতল ভূমি নাকি গভীর খাদ। এই ঘ্রাণ আর দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতার মিশেলেই ঘটে এই দুর্ঘটনা।

লোককথা বনাম বাস্তবতা

ওভারটোন ব্রিজের এই ঘটনাটি মানুষের কৌতূহলকে চিরকাল জিইয়ে রাখবে। একদিকে যেমন বিজ্ঞানের যুক্তি আছে, অন্যদিকে আছে হাজারো মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তবে আধুনিক গবেষণার ফলে এখন অনেকেই বুঝতে পারছেন যে এটি কোনো অভিশাপ নয়, বরং প্রাণীদের সহজাত প্রবৃত্তি আর স্থাপত্যের এক অদ্ভুত সমাপতন। তবুও কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেলে যখন ওভারটোন ব্রিজের ওপর দিয়ে কেউ হেঁটে যায়, তখন হোয়াইট লেডির ছায়া আর বাতাসের হাহাকার আজও মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর