মানবজাতির জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার সর্বশেষ নির্দেশনা সম্বলিত ঐশ্বরিক গ্রন্থ— পবিত্র আল-কোরআন। এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া শেষ আসমানি কিতাব, যার প্রতিটি আয়াত মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, অন্যায় থেকে ন্যায়ের দিকে আহ্বান জানায়।
এই মহাগ্রন্থ নাজিলের সূচনা হয়েছিল এক নিঃসঙ্গ, নীরব ও ঐতিহাসিক রাতে। মক্কার অদূরে, জাবালে নূর পাহাড়ে অবস্থিত ছোট্ট একটি গুহায়— হেরা গুহা।
পবিত্র মসজিদুল হারাম থেকে হেরা গুহার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। বর্তমানে আধুনিক সড়ক ও যানবাহনের কারণে সেখানে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ হলেও, দেড় হাজার বছর আগে এই পথ ছিল পাথুরে, দুর্গম ও ক্লান্তিকর। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে গুহায় পৌঁছাতে আজও সময় লাগে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা হাঁটা।
নবুয়াত প্রাপ্তির আগে এই গুহাতেই নিয়মিত ধ্যান ও ইবাদতে মগ্ন থাকতেন একজন সত্যবাদী মানুষ— যিনি তখনো নবী নন, কিন্তু মানবজাতির মুক্তির জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
হেরা গুহাটি খুবই ছোট ও সংকীর্ণ। একসঙ্গে একজন মানুষ বসতে পারেন এমন পরিসরই এর আয়তন। চারপাশে নিস্তব্ধতা— যা আত্মনিবেশের জন্য উপযোগী। ঠিক এই নীরবতার মাঝেই, চল্লিশ বছর বয়সে, রমজান মাসের এক গভীর রাতে বদলে যায় ইতিহাসের গতিপথ।
এই গুহাতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি নিয়ে হাজির হন ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)। তিনি নবিজিকে বলেন— ‘ইক্রা’, অর্থাৎ পড়ো। বিস্ময় ও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নবিজি (সা.) বলেন, ‘আমি তো পড়তে জানি না।’ এরপর নাজিল হয় পবিত্র কোরআনের প্রথম আয়াত—
‘ইক্রা বিসমি রব্বিকাল্লাজি খালাক’—
অর্থাৎ, পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
এই একটি আয়াত দিয়েই শুরু হয় মানবজাতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অধ্যায়। পরবর্তী ২৩ বছরে ধাপে ধাপে নাজিল হয় পূর্ণাঙ্গ পবিত্র কোরআন, যা মানবতার জন্য চিরন্তন দিশানির্দেশনা।
সেই রাত ছিল শুধু একটি ওহির রাত নয়— ছিল অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে আলোর আগমনের রাত, নবুয়াত প্রাপ্তির রাত। তাই শত শত বছর পেরিয়ে আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসল্লি ও দর্শনার্থী হেরা গুহায় ছুটে আসেন— কেউ ইতিহাস ছুঁতে, কেউ আত্মশুদ্ধির আশায়, আবার কেউ নীরবতার মাঝে আলোর সন্ধানে।
রমজান তাই শুধু রোজার মাস নয়— এটি কোরআনের মাস। এই মাস আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, কোরআনের আলোয় নিজের জীবন ও সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান।