মদিনা, শান্তির শহর। ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে মসজিদে নববীর সরু গলিপথ পার হওয়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চোখ রাখলেই দেখা মেলে এক নীরব, ঐতিহাসিক ভূমি— জান্নাতুল বাকি। এটি শুধু একটি কবরস্থান নয়; এটি ইসলামের প্রথম ও প্রাচীনতম কবরস্থান, যেখানে শুয়ে আছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবার, সাহাবি, এবং ইসলামের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা।
জান্নাতুল বাকি প্রথমে পরিচিত ছিল ‘বাকি আল-গারকদ’ নামে। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হিজরতের পরপরই মুসলিমদের প্রথম দাফনের জন্য এটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে। একসময় এই ভূমি ছিল নিছক মরুভূমি, যেখানে কাঁটা গাছ ও বালুর বিস্তৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম পবিত্র কবরস্থানে পরিণত হয়।
প্রথম দাফন এই কবরস্থানে করা হয় মহানবী (সা.)-এর কন্যা রুকাইয়া বিনতে মুহাম্মদ (রা.)-এর। বদর যুদ্ধে আহত অবস্থায় অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন তিনি, এবং নবীজি (সা.) নিজ হাতে তার দাফন করেন। এরপর একে একে এখানে শায়িত হন নবীজি (সা.)-এর অন্যান্য প্রিয় আত্মীয় এবং সাহাবি। এর মধ্যে রয়েছেন নবীজি (সা.)-এর ফুফু সাফিয়া বিনতে আব্দুল মুত্তালিব (রা.), আত্মিকা (রা.), আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা.), আকিল বিন আবি তালিব (রা.), এবং প্রিয় কন্যারা—ফাতিমা (রা.), জয়নাব (রা.), উম্মে কুলসুম (রা.)। নবীজি (সা.)-এর শিশু পুত্র ইব্রাহিম (রা.)-ও এখানে শায়িত।
এছাড়াও জান্নাতুল বাকিতে রয়েছে হাররা যুদ্ধে শহীদদের কবর। তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.)—যিনি ইসলামী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন— তার কবরও এখানে। এছাড়াও ইসলামী জ্ঞানের এক মহান ব্যক্তিত্ব ইমাম মালিক (রহ.) এবং তার শিক্ষক ইমাম নাফি (রহ.)-ও এই নীরব কবরস্থানে শায়িত।
জান্নাতুল বাকি কেবল একটি কবরস্থান নয়; এটি ত্যাগের ইতিহাস, ভালোবাসার স্মৃতি এবং জান্নাতের প্রতিশ্রুতির নীরব সাক্ষ্য। এখানকার প্রতিটি কবর যেন আজও ইসলামের উজ্জ্বল ইতিহাসকে সাক্ষ্য দেয়। যারা এখানে দাঁড়িয়ে দোয়া করেন, তারা অনুভব করেন— এখানকার মাটি নয়, ইতিহাস কথা বলছে।
মদিনার এই নীরব কবরস্থানে শুয়ে আছেন তারা, যাদের জীবন, ত্যাগ এবং বিশ্বাসের জন্য আজ আমরা মুসলিম হয়ে বেঁচে আছি। জান্নাতুল বাকি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ধর্মীয় ঐতিহ্য, ন্যায় ও মানবিকতা কখনো মরবে না। এটি শুধু অতীত নয়; এটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক জীবন্ত শিক্ষা।