২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে আমরা যখন একটি স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন ই-কমার্স খাতের অভিভাবক সংগঠন ‘ই-ক্যাব’-এর স্থবিরতা আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে। একজন ই-কমার্স উদ্যোক্তা হিসেবে গত কয়েক মাসে আমরা যে নজিরবিহীন অনিশ্চয়তা ও নীতিগত শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা এই খাতের ৫ লক্ষাধিক উদ্যোক্তার অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপট থেকেই ই-ক্যাব নির্বাচন এবং নির্বাচিত নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এই বিশদ বিশ্লেষণ।
প্রশাসনিক স্থবিরতা বনাম ভিশনারি নেতৃত্ব: কেন প্রশাসক পলিসি মেকিংয়ে যথেষ্ট নন
ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোতে প্রশাসকের মূল কাজ হলো রুটিন মাফিক দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করা এবং দ্রুততম সময়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়া। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসক দিয়ে চললে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়…
পলিসি অ্যাডভোকেসির অভাব: নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরাসরি উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে আসেন, ফলে তারা খাতের বাস্তব সমস্যাগুলো (যেমন: ট্যাক্স, ভ্যাট, লজিস্টিকস জটিলতা) সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন। প্রশাসক একজন সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তার পক্ষে সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি বা পলিসি লেভেলে জোরালো ভূমিকা রাখা কঠিন।
আস্থার সংকট: বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং স্থানীয় স্টেকহোল্ডাররা নির্বাচিত বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় যতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, অ্যাডহক বা প্রশাসক কাঠামোর ক্ষেত্রে ততটা করেন না।
অর্থনৈতিক ও পরিসংখ্যানগত প্রভাব: দৃশ্যমান ঝুঁকি
বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের বাজার বর্তমানে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপরে এবং এর প্রবৃদ্ধির হার বার্ষিক প্রায় ২৫ শতাংশ। কিন্তু নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে আমরা যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে আছি …
বিনিয়োগ স্থবিরতা: ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ই-কমার্স খাতে যে পরিমাণ স্টার্টআপ বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা ছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংগঠনের সঠিক নির্দেশনার অভাবে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষতি: ই-ক্যাবের প্রায় তিন হাজারের বেশি সদস্যের বড় অংশই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। বর্তমান সরকারের নতুন মুদ্রানীতি ও ঋণের উচ্চ সুদের হারের এই সময়ে তাদের জন্য বিশেষায়িত এসএমই লোন বা প্রণোদনার বিষয়ে কথা বলার মতো কোনও নির্বাচিত প্ল্যাটফর্ম নেই।
ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স: ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ই-কমার্স বড় ভূমিকা রাখতে পারতো। কিন্তু সঠিক পলিসি সাপোর্ট না থাকায় আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছি।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অস্থিরতা: আমাদের ই-কমার্স কি সুরক্ষিত
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান-ইসরায়েল-আমেরিকা উত্তেজনার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতেও সরাসরি অনুভূত হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় কেন একজন প্রশাসক নয়, বরং নির্বাচিত নেতৃত্বের কৌশলগত অবস্থান প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করা হলো…
জ্বালানি তেলের মূল্য ও লজিস্টিকস খরচ: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ বাড়লে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে এর প্রভাবে ডেলিভারি ও লজিস্টিকস খরচ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি প্যানেল এই সময়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বসে ডেলিভারি চার্জের যৌক্তিক পুনর্নির্ধারণ বা উদ্যোক্তাদের জন্য জ্বালানি ভর্তুকির দাবিতে জোরালো ওকালতি করতে পারে।
সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়া: যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর সহ গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় আমদানিকৃত কাঁচামাল এবং ই-কমার্স পণ্যের লিড-টাইম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স এবং ড্রপশিপিং মডেলের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তারা বড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
ডলার সংকট ও পেমেন্ট গেটওয়ে: ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ডলারের বিনিময় হারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। ই-কমার্স খাতের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার সাবস্ক্রিপশন, ফেসবুক/গুগল অ্যাডভার্টাইজিং ফি এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেটলমেন্টের ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়, তা নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের জন্য টেকনিক্যাল নলেজ সম্পন্ন নির্বাচিত নেতৃত্বের কোনও বিকল্প নেই।
স্টেকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট ও বর্তমান সরকারের সঙ্গে সমন্বয়: সংস্কারের রূপরেখা
বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তরে সংস্কারের যে বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে, ই-কমার্স খাত তার বাইরে নয়। তবে এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় খাতের প্রকৃত অংশীদারদের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে বিষয়গুলো অত্যন্ত জরুরি …
ডিজিটাল কমার্স অ্যাক্ট ও যুগোপযোগী পলিসি সংস্কার: পূর্ববর্তী সরকারের করা অনেক আইন ও নীতিমালা বর্তমানে খাতের বিকাশে সহায়ক না হয়ে বরং বাধার সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ এবং ডিবিআইডি নিবন্ধনের জটিলতা দূর করা দরকার। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বচ্ছ, ব্যবসাবান্ধব এবং বৈষম্যহীন ডিজিটাল কমার্স অ্যাক্ট প্রণয়নে সরকারের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন।
পেমেন্ট গেটওয়ে, লজিস্টিকস ফি ও ক্যাশ-অন-ডেলিভারি সংকট: ই-কমার্স ব্যবসায় লেনদেনের খরচ কমানো এখন সময়ের দাবি। গেটওয়ে চার্জ কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং লজিস্টিকস খরচ নিয়ন্ত্রণে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সঙ্গে সমন্বিত কাজ করা জরুরি। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী ডেলিভারি রেট নিশ্চিত করা এবং পেমেন্ট সেটলমেন্টের সময়সীমা কমিয়ে আনার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে জোরালো ওকালতি প্রয়োজন।
মার্কেট মনিটরিং ও আস্থার সংকট নিরসন: বিগত বছরগুলোতে কিছু অসাধু প্ল্যাটফর্মের কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই আস্থার সংকটে ভুগছে। অ্যাস্ক্রো (Escrow) সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করা এবং ভোক্তাদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা দরকার। একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ গাইডলাইন তৈরির মাধ্যমে বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলেই কেবল ই-কমার্স খাতে আস্থার স্থিতিশীলতা ফিরবে।
স্মার্ট ট্যাক্স ও ভ্যাট কাঠামো: ই-কমার্স একটি বিকাশমান খাত। এই খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে বরং তাদের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ট্যাক্স হলিডে বা বিশেষ ছাড় দেয়ার বিষয়ে এনবিআর-এর সঙ্গে আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
কেন এখনই নির্বাচন? পরিসংখ্যান যা বলছে
সদস্য সংখ্যা বনাম প্রতিনিধিত্ব: ২,০০০-এর বেশি সক্রিয় সদস্যের স্বার্থ রক্ষার জন্য ১১ জন নির্বাচিত পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে একজনের (প্রশাসক) পক্ষে এই বিশাল বৈচিত্র্যময় খাতের সবার কথা শোনা বা অনুধাবন করা অসম্ভব।
বাজার সম্প্রসারণ: ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে বিজনেস-টু-গভর্নমেন্ট (বি২জি) লিংকেজ তৈরি করতে শক্তিশালী বোর্ড প্রয়োজন।
পেশাদার ও অরাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা
একটি ব্যবসায়িক সংগঠনের মূল শক্তি হলো এর নেতৃত্বের পেশাদারিত্ব। ই-কমার্স খাতের জটিলতাগুলো বোঝার জন্য কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং এই ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এবং অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজন।
ব্যবসায়িক পেশাদারিত্ব: ই-ক্যাবকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট সংগঠন হিসেবে গড়ে তুলতে এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা ডেটা-চালিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং যাদের বিশ্ববাজারের সাপ্লাই চেইন ও ডিজিটাল ইকোনমি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রয়েছে।
অরাজনৈতিক অবস্থান: ব্যবসায়িক নেতৃত্ব যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, তবে সাধারণ উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সংস্কারের সময়ে তাই ব্যবসায়িক পরিচয়ই প্রথম পরিচয় এমন অরাজনৈতিক ও দক্ষ নেতৃত্বই এই খাতের আস্থার সংকট দূর করতে পারে।
সংকট উত্তরণে কেন অভিজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বই একমাত্র সমাধান?
প্রশাসনিক কাঠামো সাধারণত রুটিন মাফিক কাজ করে, কিন্তু যুদ্ধ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মতো ক্রাইসিস পিরিয়ডে প্রয়োজন হয় প্রো-অ্যাক্টিভ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব।
হ্যান্ডস-অন এক্সপেরিয়েন্স: ই-কমার্স ব্যবসার খুঁটিনাটি (যেমন: পেমেন্ট গেটওয়ে রেট, লজিস্টিকস জটিলতা, কাস্টমার সার্ভিস স্ট্যান্ডার্ড) যারা নিজের ব্যবসায় প্রতিদিন ফেস করেন, তারাই নীতিনির্ধারণী সভায় সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
অংশীদারিত্ব ও ওকালতি: নির্বাচিত প্রতিনিধিরা উদ্যোক্তাদের ৫০০০+ ম্যান্ডেট নিয়ে সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশন এবং জরুরি রিস্ক মিটিগেশন ফান্ড গঠনের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারেন। অরাজনৈতিক ও পেশাদার বোর্ড থাকলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দাতা সংস্থাগুলোর কাছেও সংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
কৌশলগত সুপারিশমালা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
বর্তমান পরিস্থিতি এবং ই-ক্যাবের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ তুলে ধরা হলো…
গ্লোবাল ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স সেল: বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়মিত বিশ্লেষণ করে উদ্যোক্তাদের আগাম সতর্কতা প্রদান।
সেক্টর-ভিত্তিক ডেটাবেজ ও ক্লাসিফিকেশন: এফ-কমার্স, লজিস্টিকস ও মার্কেটপ্লেস উদ্যোক্তাদের আলাদাভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা।
বিকল্প সরবরাহ চেইন ও রুট ম্যাপ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এড়াতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সঙ্গে সরাসরি বিকল্প বাণিজ্যিক রুট ব্যবহারের বিষয়ে লবিং করা।
মুদ্রা বিনিময় ও পেমেন্ট অটোমেশন: ডলার নির্ভরতা কমিয়ে দ্বিপাক্ষিক মুদ্রায় লেনদেন এবং পেমেন্ট গেটওয়ে সহজীকরণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে নীতি-নির্ধারণী সংলাপ।
ই-ক্যাবের নির্বাচন এখন আর কেবল কোনও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি দেশের ই-কমার্স খাতের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। দ্রুত নির্বাচনই পারে এই খাতকে সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও অর্থনৈতিক মন্দা থেকে সুরক্ষা দিতে। একজন প্রশাসক কেবল একটি সংগঠনের কেয়ারটেকার হতে পারেন, কিন্তু একটি উদীয়মান অর্থনীতির স্থপতি হতে পারেন না। তাই নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিনীত আহ্বান, এই খাতের বৃহত্তর স্বার্থে দ্রুততম সময়ে অরাজনৈতিক, পেশাদার ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্বের জন্য নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করুন।
লেখক: ই-কমার্স উদ্যোক্তা এবং বিশ্লেষক