আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু অস্ত্র, ট্যাংক বা যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করে না; বরং ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে ওঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এআই কর্মসূচি ‘প্রজেক্ট মেভেন’ বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত, হামলার পরিকল্পনা এবং সামরিক তথ্য বিশ্লেষণে বড় ভূমিকা রাখছে। আধুনিক যুদ্ধকৌশলে এই প্রযুক্তি এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
প্রজেক্ট মেভেন কী
প্রজেক্ট মেভেন হলো পেন্টাগনের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রকল্প, যা ২০১৭ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়। শুরুতে এর প্রধান কাজ ছিল ড্রোন থেকে আসা বিপুল পরিমাণ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শনাক্ত করা। আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও দেখে শত্রুর অবস্থান বা সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করতে হতো।
প্রজেক্ট মেভেন সেই কাজটি কয়েক সেকেন্ডে করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এটি ভিডিও, ছবি ও সেন্সর ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। গত কয়েক বছরে এটি আরও উন্নত হয়ে এখন যুদ্ধক্ষেত্র পরিচালনা ও হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে এই এআই সিস্টেম
প্রজেক্ট মেভেনকে অনেক বিশেষজ্ঞ যুদ্ধক্ষেত্রের ‘ডিজিটাল কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এটি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য, সেন্সর ডেটা এবং সৈন্য মোতায়েনের তথ্য। এসব তথ্য একত্র করে এটি যুদ্ধক্ষেত্রের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করে। এরপর সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করে এবং কমান্ডারদের সামনে বিভিন্ন হামলার বিকল্প উপস্থাপন করে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাষাভিত্তিক এআই প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় এখন সাধারণ ভাষায় নির্দেশ দিয়েও এই সিস্টেম ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে অ্যান্থ্রপিক এর তৈরি ক্লাউডি এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা আলোচনায় এসেছে।
গুগল কেন এই প্রকল্প থেকে সরে যায়
শুরুতে গুগল এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে গুগলের হাজার হাজার কর্মী সামরিক কাজে এআই ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তাদের দাবি ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ক্ষতি করার কাজে ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক কর্মী পদত্যাগও করেন। এর পর গুগল তাদের চুক্তি নবায়ন করেনি এবং ঘোষণা দেয় যে তারা সরাসরি মারণাস্ত্র উন্নয়নে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে গুগল তাদের সেই নীতি কিছুটা শিথিল করেছে বলে প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনা রয়েছে।
পালান্টিরের ভূমিকা
২০২৪ সালে গুগলের জায়গায় এই প্রকল্পে যুক্ত হয় পালান্টির টেকনোলজিস। প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই গোয়েন্দা ও সামরিক তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। বর্তমানে প্রজেক্ট মেভেনের মূল প্রযুক্তিগত ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে পালান্টির। তাদের তৈরি ডেটা বিশ্লেষণ ও এআই প্ল্যাটফর্ম যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প মনে করেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে যে দেশ দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, সেই দেশই এগিয়ে থাকবে।
যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা কার্যকর
মার্কিন সামরিক অভিযানে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে খুব দ্রুত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও হামলা পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিছু সামরিক অভিযানে অল্প সময়ের মধ্যে শত শত লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এআই বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এআই ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করলে ভুল লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঝুঁকি থাকে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে। তাই এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নৈতিক বিতর্কও বাড়ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধ ও এআই
বিশ্লেষকদের মতে, প্রজেক্ট মেভেন দেখিয়ে দিয়েছে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে ডেটা, অ্যালগরিদম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ সবকিছুতেই এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফলে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশগুলো সামরিক ক্ষেত্রেও আরও এগিয়ে যাবে, আর প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে। প্রজেক্ট মেভেন শুধু একটি সামরিক সফটওয়্যার নয় এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধের ধরনই বদলে দিচ্ছে।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, কমপিউটার বিচিত্রা