Sunday 05 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘স্ট্রিট পারফরম্যান্স’ রাজপথে সুরের উপার্জনে বেঁচে থাকা

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৫ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৫০ | আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৫৪

ইউরোপের কোনো প্রাচীন শহরের পাথুরে পথ ধরে হাঁটছেন, হঠাৎ কানে এলো অ্যাকর্ডিয়নের মিষ্টি সুর। কিংবা সিঙ্গাপুরের ব্যস্ত সাবওয়ে দিয়ে যাওয়ার পথে থমকে দাঁড়াতে হলো এক গিটারিস্টের জাদুকরী আঙুলের ছোঁয়ায় ও গানের মূর্ছনায়।

ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক রাজপথই কেবল ট্রাফিক বা ব্যস্ততা নয়, বরং এক উন্মুক্ত মঞ্চ। যেখানে ভিক্ষাবৃত্তি বা সাধারণ সাহায্য চাওয়ার চিরাচরিত ধারণাকে বদলে দিয়ে শিল্পীরা ছড়িয়ে দেন আনন্দ। এই যে শিল্পের বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের এক স্বাধীন সংস্কৃতি, যা বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে এক অনন্য রূপ ধারণ করেছে যা স্ট্রিট পারফরম্যান্স নামে পরিচিত।

স্ট্রিট পারফরম্যান্সের সহজ-সুন্দর গল্প

বিজ্ঞাপন

একটু থামুন। ব্যস্ত পথের মাঝখানে হঠাৎ ভেসে আসে গিটারের সুর। কেউ দাঁড়িয়ে গান গাইছে, পাশে রাখা খোলা ব্যাগে কয়েকটা কয়েন। আবার কোথাও কেউ বসে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। সামনে মানুষ থেমে শুনছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ মাথা নেড়ে তাল দিচ্ছে।

এই দৃশ্যটাই স্ট্রিট পারফরম্যান্স ও রাস্তার মঞ্চ। মানুষের জন্য মানুষের মাঝেই তৈরি হওয়া এক অনন্য শিল্প।

শুরুটা কোথায়, কবে?

স্ট্রিট পারফরম্যান্স বা বাস্কিংয়ের ইতিহাস অনেক পুরোনো। নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের মধ্যযুগে (প্রায় দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী) ভ্রাম্যমাণ শিল্পীরা শহর থেকে শহরে ঘুরে গান, কবিতা আবৃত্তি, গল্প বলা ও বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মানুষকে বিনোদন দিতেন।

তখন তারা নির্দিষ্ট কোনো মঞ্চে নয়, খোলা জায়গায়,বাজার, রাস্তা বা চত্বরে পারফর্ম করতেন এবং দর্শকদের কাছ থেকে স্বেচ্ছা অনুদান পেতেন। এই প্রথাই ধীরে ধীরে আজকের স্ট্রিট পারফরম্যান্সের ভিত্তি তৈরি করে।

শব্দের উৎস ও অর্থ

‘বাস্কিং’ শব্দটির ব্যবহার ইউরোপেই জনপ্রিয় হয়। এর অর্থ, খোলা জায়গায় পারফর্ম করে দর্শকদের কাছ থেকে স্বেচ্ছা অর্থ গ্রহণ করা।

অর্থাৎ, এটি শুধুমাত্র গান বা অভিনয় নয়, বরং শিল্প আর মানুষের সরাসরি সংযোগের একটি পদ্ধতি।

কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বজুড়ে?

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে উনিশ ও বিশ শতকে শহরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার বিনোদনের চাহিদা বাড়ে।

পরবর্তীতে পর্যটননির্ভর শহরগুলো, যেখানে মানুষ ঘুরতে আসে, নতুন কিছু দেখতে চায়। সেখানে স্ট্রিট পারফরম্যান্স বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সংগীতশিল্পী, জাদুশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, এমনকি জীবন্ত মূর্তিরাও এই ধারার অংশ হয়ে ওঠেন।

সুরের মূর্ছনায় রাজপথের প্রাণ

ব্রাসেলসের ‘মাউন্ট অফ আর্টস’ বা এই জাতীয় উন্মুক্ত চত্বরে বসলে দেখা যায় দুই বা ততোধিক শিল্পী অ্যাকর্ডিয়ন নিয়ে বসে আছেন। তাদের কোলের বাদ্যযন্ত্র থেকে ঝরে পড়ছে ধ্রুপদী সুর। সামনে রাখা একটি ছোট টুপি বা বাক্সে পথচারীরা স্বেচ্ছায় ফেলে যাচ্ছেন খুচরো ইউরো। একে কেবল ভিক্ষাবৃত্তি বলা ভুল হবে; বরং এটি এক ধরনের ‘স্ট্রিট পারফরম্যান্স’ বা ‘বাস্কিং’। এই শিল্পীরা কেবল অর্থের জন্য নয়, বরং নিজের শিল্পকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ভালোবাসেন। সিঙ্গাপুরের মতো আধুনিক শহরেও পাতাল রেলের প্রবেশপথে দেখা যায় কোনো এক নিঃসঙ্গ গিটারিস্টকে, যার গানের সুর যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তিকে এক নিমেষে ভুলিয়ে দেয়। এই সুরের মায়াজালে আটকা পড়ে অনেক পথচারীই থমকে দাঁড়ান, প্রশংসা করেন এবং হাসিমুখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

শিল্পের স্বাধীনতা ও পর্যটনের নতুন মাত্রা

বিদেশের এই সংস্কৃতিতে একটি স্বচ্ছ নিয়ম কাজ করে। অনেক শহরে এই বাস্কিং বা পথ-প্রদর্শনের জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। এটি যেমন তাদের আয়ের উৎস, তেমনি শহরের পর্যটনকেও আকর্ষণীয় করে তোলে। পর্যটকরা কেবল ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসেন না, বরং রাজপথের এই জীবন্ত আবহ উপভোগ করতেও পছন্দ করেন। এখানে দাতা এবং গ্রহীতার মাঝে কোনো করুণার সম্পর্ক নেই। বরং আছে পারস্পরিক বিনিময়, একজন দিচ্ছেন আনন্দ আর অন্যজন দিচ্ছেন তার যোগ্য সম্মান।

বিদেশের রাজপথে এই দৃশ্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পেট চালানোর লড়াইটাও কতোটা নান্দনিক হতে পারে। কেউ সুর দিয়ে, কেউ অভিনয় দিয়ে, আবার কেউ নিছক স্তব্ধতা দিয়ে জয় করে নিচ্ছেন মানুষের মন। দিনশেষে তাদের সেই ছোট টুপি বা বাটিতে জমে থাকা মুদ্রাগুলো কেবল সংখ্যা নয়, বরং অসংখ্য মানুষের হাসিমুখের স্বীকৃতি। শিল্প যখন রাজপথে নেমে আসে, তখন শহরটা আর কেবল কংক্রিটের থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত নাট্যমঞ্চ।

প্রচ্ছদের ছবি: লেখক

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর