নিস্তব্ধ গোরস্থান, চারদিকে পাথরের ফলকগুলো যেন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে একেকটি জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে। হঠাৎ কোনো একটি ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে যদি দেখেন সেখানে লেখা ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না!’ তবে চমকে ওঠাটাই স্বাভাবিক। মৃত্যু মানেই কি সব শেষ? নাকি পাথরের গায়ে খোদাই করা কয়েকটা শব্দে বেঁচে থাকে মানুষের আজন্মলালিত হাহাকার, আনন্দ বা কোনো গূঢ় রহস্য? আজ ৬ এপ্রিল, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে এমনই এক অদ্ভুত ও রোমহর্ষক দিবস ‘প্ল্যান ইওর এপিটাফ ডে’। এটি এমন এক দিন যখন জীবিত মানুষ নিজেই পরিকল্পনা করেন তার সমাধিফলকে শেষ বিদায়ের বার্তাটি ঠিক কী হবে। বিষয়টি শুনতে কিছুটা ভুতুড়ে মনে হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে জীবনের এক গভীর দর্শন ও শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ।
পাথরের গায়ে খোদাই করা শেষ সংলাপের নেপথ্যে
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি তাদের সমাধিফলক বা এপিটাফ নিয়ে ছিলেন ভীষণ সচেতন। ইংরেজ কবি জন কিটসের এপিটাফে লেখা আছে এক বিষণ্ন উক্তি ‘এখানে এমন একজনের দেহ শায়িত যার নাম জলের ওপর লেখা হয়েছিল’। আবার বিশ্ববিখ্যাত কমেডিয়ান স্পাইক মিলিগান তার মৃত্যুপরবর্তী পরিচিতি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন চরম রসিকতা। এই দিবসটি মূলত মানুষকে সুযোগ করে দেয় নিজের জীবনের সারসংক্ষেপ এক লাইনে ফুটিয়ে তোলার। কেউ হয়তো চান তার কবরের সামনে এসে কেউ দাঁড়ালে যেন তার মুখে এক চিলতে হাসি ফোটে, আবার কেউ চান নিজের জীবনের কোনো অপূর্ণতা বা গূঢ় সত্য লিখে রেখে যেতে। এই দিনটি আসলে মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার নয়, বরং মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করে নিজের শেষ গল্পটা নিজেই লিখে যাওয়ার এক অনন্য সুযোগ।
জীবনবোধ ও আত্মদর্শনের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন
নিজের এপিটাফ নিজে পরিকল্পনা করার পেছনে কাজ করে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি। আমরা সাধারণত মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে ভয় পাই, কিন্তু যখন কেউ নিজের সমাধিফলকের লেখাটি নিয়ে ভাবতে বসেন, তখন তিনি আসলে তার পুরো জীবনটাকে নতুন করে মূল্যায়ন করেন। আমি কি আমার পেশাগত পরিচয়ে পরিচিত হতে চাই নাকি আমার মানবিক গুণাবলি দিয়ে? এই প্রশ্নটি মানুষকে বর্তমান জীবনের প্রতি আরও যত্নশীল করে তোলে। ৬ এপ্রিল এই অদ্ভুত দিবসে অনেকেই ডায়েরি নিয়ে বসেন তাদের জীবনের সেই ‘ফাইনাল টাচ’ বা শেষ বাক্যটি নির্ধারণ করতে। এটি কেবল একটি পাথরের ফলকের লেখা নয়, এটি হলো একজন মানুষের পৃথিবীর বুকে রেখে যাওয়া শেষ স্বাক্ষর যা যুগ যুগ ধরে পথচারীদের মনে করিয়ে দেবে যে এখানে একসময় এক প্রাণবন্ত হৃদয়ের স্পন্দন ছিল।
মজার ও বিচিত্র সব এপিটাফ ভাবনা
পৃথিবীর নানা প্রান্তে এই দিনটি এখন বেশ মজার ছলে উদযাপিত হয়। ভোজনরসিক কেউ হয়তো লিখে রাখছেন ‘এখানে শায়িত ব্যক্তির শেষ ইচ্ছা ছিল আরও এক বাটি বিরিয়ানি খাওয়া, কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না!’ আবার প্রযুক্তিপ্রেমী কেউ হয়তো তার এপিটাফে একটি কিউআর কোড বসানোর কথা ভাবছেন, যা স্ক্যান করলেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলো স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। কেউ আবার লিখেছেন, ‘নিচে ঘুমাচ্ছি, দয়া করে পা টিপে হাঁটুন!’ এই ধরনের রসিকতা শোকের আবহকে হালকা করে দেয় এবং মৃত্যুকে জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিতে শেখায়। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন সংক্ষিপ্ত আর অনিশ্চিত, তাই যাওয়ার আগে নিজের পরিচয়টুকু নিজের মতো করে রেখে যাওয়াটাই আসল বীরত্ব।
সৃজনশীলতা ও শেষ বিদায়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি
নিজের সমাধিফলকের লেখাটি নিজেই ঠিক করে যাওয়া মানে হলো নিজের জীবনের পাণ্ডুলিপির শেষ পাতাটি নিজের হাতে লেখা। অন্যের ওপর দায়িত্ব না ছেড়ে নিজেই নিজের পরিচয় দিয়ে যাওয়াটা এক ধরনের স্বাধীনতা। এটি আমাদের শেখায় যে জীবনের শেষ গন্তব্যটিও সুন্দর ও অর্থবহ হতে পারে। আপনি যদি আজ নিজের এপিটাফ লিখতে বসেন, তবে কী লিখবেন? কোনো দার্শনিক উক্তি নাকি প্রিয় কোনো কবিতার লাইন? এই ভাবনার মাঝেই লুকিয়ে আছে জীবনের সার্থকতা। প্রতি বছর ৬ এপ্রিল হাজারো মানুষ তাদের জীবনের সেই চূড়ান্ত বাক্যটি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন যা শত বছর ধরে কোনো এক ধূসর পাথরের গায়ে খোদাই করা থাকবে এবং পৃথিবীর মানুষকে জানিয়ে দেবে তার অস্তিত্বের কথা।