Monday 06 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘অ্যান্ডারসন’ ইতিহাসের চাকায় একটি বৈদ্যুতিক আভিজাত্যের প্রতীক

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৬ এপ্রিল ২০২৬ ২১:০৩ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২৬ ২১:১৭

প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, টাইম মেশিনে চেপে ১৯শ শতাব্দী থেকে কোনো রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি সরাসরি সামনে চলে এসেছে। তবে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এটি ঘোড়ায় টানা নয়, বরং বিদ্যুতে চলা এক ঐতিহাসিক আভিজাত্য। এর নাম ‘অ্যান্ডারসন’। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড প্লেস চত্বরে বর্তমানে এই গাড়িটি পর্যটন ও ইতিহাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

অ্যান্ডারসন: একটি যান্ত্রিক পুনর্জন্ম

ব্রাসেলসের এই পাথর বিছানো পথে যে গাড়িটি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ছে , সেটি আসলে ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্কটিশ উদ্ভাবক রবার্ট অ্যান্ডারসনের তৈরি করা বিশ্বের প্রথম দিকের বৈদ্যুতিক যানের একটি নিখুঁত প্রতিরূপ বা রিপ্রোডাকশন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পোল্যান্ডে গত বছর এই বিশেষ প্রতিরূপটি তৈরি করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গাড়িটির দায়িত্বে থাকা একজন সারাবাংলাকে জানালেন, ‘আমরা এখানে ১৯শ শতাব্দীর প্রথম বৈদ্যুতিক যানের (ইলেকট্রিক ভেহিকল) একটি প্রতিরূপ (রিপ্রোডাকশন) দেখতে পাচ্ছি। এটার নাম অ্যান্ডারসন, এবং এই প্রতিরূপটি গত বছর পোল্যান্ডে তৈরি করা হয়েছে। এটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো অটোমোবাইল ইতিহাসের সেই সোনালী সময়কে পুনরুজ্জীবিত করা, যখন পেট্রোল ইঞ্জিনের দাপট শুরু হয়নি এবং বৈদ্যুতিক গাড়িই ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। তাই দর্শনার্থীরাও ব্রাসেলসের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড প্লেস চত্বর ঘুরতে এসে এই গাড়িটি দেখে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যায়।’

ইতিহাস ও আধুনিকতার সন্ধিক্ষণ

১৮৩২ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে রবার্ট অ্যান্ডারসন যখন প্রথম বৈদ্যুতিক রথ তৈরি করেন, তখন সেটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। সেই আদি অনুপ্রেরণাকে ধারণ করেই এই আধুনিক সংস্করণটি নির্মাণ করা হয়েছে। গাড়িটির চাকা থেকে শুরু করে বসার আসন- সবই ভিন্টেজ লুক ধরে রাখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। এটি সম্পূর্ণ নিঃশব্দ এবং ধোঁয়াহীন, যা আধুনিক ব্রাসেলসের পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকারের সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্রাসেলসের সিটি সেন্টারে পর্যটকদের ঐতিহ্যের স্বাদ দিতে এবং রাজকীয় ঢঙে শহর ভ্রমণের সুযোগ করে দিতেই এই যানের আনাগোনা।

ঘোড়াহীন গাড়ির সেই সোনালী ইতিহাস

১৮৩০-এর দশকে যখন মানুষ যাতায়াতের জন্য পুরোপুরি ঘোড়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, ঠিক তখনই স্কটিশ উদ্ভাবক রবার্ট অ্যান্ডারসন বিশ্বের প্রথম অপরিশোধিত বৈদ্যুতিক রথ তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল এক জাদুকরী উদ্ভাবন। ১৮৩২ থেকে ১৮৩৯ সালের মধ্যে অ্যান্ডারসন তার এই বৈদ্যুতিক যানটি তৈরি করেন। যদিও তখন রিচার্জেবল ব্যাটারি আবিষ্কৃত হয়নি, তবুও তার এই প্রচেষ্টা অটোমোবাইল ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। সে যুগে পেট্রোল চালিত গাড়ি ছিল অত্যন্ত শব্দবহুল, ধোঁয়াটে এবং স্টার্ট দেওয়া ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। তার বিপরীতে অ্যান্ডারসনের আদলের এই বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো ছিল শান্ত, ধোঁয়াহীন এবং আভিজাত্যের প্রতীক। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত মহলে এবং নারীদের কাছে এটি ছিল অত্যন্ত পছন্দের।

আধুনিক কারিগরি ও নান্দনিকতা

ব্রাসেলসের রাস্তায় যে অ্যান্ডারসন প্রতিরূপটি দেখা যাচ্ছে, তাতে ইতিহাসের সেই আদি রূপকে অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। এর বড় বড় স্পোকওয়ালা চাকা, সামনে রাখা কাঠের স্টোরেজ বক্স এবং কোচের বসার আসনটি অবিকল সেই পুরনো আমলের রাজকীয় ঢঙে তৈরি। গাড়ির সামনে বসানো বড় কাঁচের ল্যাম্পগুলো যেন সেই অন্ধকার যুগের রাস্তার মায়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ এই ভিন্টেজ আবরণের নিচেই লুকিয়ে আছে আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তি, যা নিঃশব্দে গাড়িটিকে এগিয়ে নিয়ে চলে।

আভিজাত্য যখন পথের সাথী

পর্যটকরা এই গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেন। কেউবা অবাক বিস্ময়ে এর কারুকার্য দেখে মুগ্ধ হন। গাড়িটির পেছনের অংশে থাকা ‘BXL’ সম্বলিত বেলজিয়ামের লাইসেন্স প্লেটটি একে বর্তমান সময়ের সাথে যুক্ত করেছে। গ্র্যান্ড প্লেসের কারুকার্যময় দালানগুলোর সামনে এই গাড়িটি দাঁড়ানো অবস্থায় মনে হয়, যেন এক জীবন্ত মিউজিয়াম আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। একজন দর্শনার্থী সারাবাংলাকে বললেন,

‘অ্যান্ডারসনের মতো এই গাড়িগুলো কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এগুলো মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির প্রতীক। যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশবান্ধব যানের চিন্তাটি আসলে আজকের নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন।’

পরিশেষ

আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে যখন আমরা যান্ত্রিকতার ভিড়ে ক্লান্ত, তখন ব্রাসেলসের পথে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘অ্যান্ডারসন’ আমাদের এক মুহূর্তের জন্য হলেও সেই শান্ত, ধীরস্থির এবং রাজকীয় অতীতে নিয়ে যায়। ইতিহাসের চাকা এভাবেই ঘোরে; কখনো ধুলোবালি মাখা পথে, আর কখনোবা রাজকীয় পাথুরে চত্বরে স্মৃতির আভিজাত্য ছড়িয়ে। অ্যান্ডারসনের এই প্রতিরূপটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থার শেকড় আসলে অনেক গভীরে পোঁতা ছিল। গ্র্যান্ড প্লেসের গথিক স্থাপত্যের সামনে এই গাড়িটির অবস্থান যেন অতীত আর বর্তমানের এক জীবন্ত কোলাজ।

ছবি: লেখক

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর