ব্রাসেলস এর শহরের বুকেই শুয়ে আছেন এক ‘ঘুমন্ত বীর’, যার নিথর শরীর ছুঁয়ে মানুষ খোঁজে নিজের ভাগ্যের দরজা খোলার চাবি । অবাক হচ্ছেন ? হুম সত্যি! গ্রাঁ প্লাসের কোলাহল পেরিয়ে, চার্লস বুলস স্ট্রিটের এক কোণে ভিড় জমে অদ্ভুত এক দৃশ্যকে ঘিরে। সেখানে ব্রোঞ্জের শয্যায় শায়িত এভারার্ড টি’সারক্লাস। তিনি একজন বীর, এক কিংবদন্তি, আর বহু মানুষের কাছে এক অলৌকিক আশার প্রতীক। পর্যটকদের হাতের স্পর্শে তার শরীরের রঙ বদলে গেছে, কিন্তু বিশ্বাসের দীপ্তি আজও অমলিন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই মূর্তিতে হাত বুলিয়ে দিলে জীবন বদলে যায় বা পূরণ হয় গোপন কোনো বাসনা। কেবল পর্যটক নয়, স্থানীয়দের কাছেও এটি পরম ভক্তি আর বীরত্বের এক অনন্য প্রতীক।
স্থাপনের প্রেক্ষাপট ও শৈল্পিক ইতিহাস
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এভারার্ড টি’সারক্লাস ব্রাসেলসের একজন অত্যন্ত সম্মানিত নাগরিক ও বীর যোদ্ধা ছিলেন। ১৩৫৬ সালে ব্রাসেলস শহর যখন বহিঃশত্রুর কবলে পড়ে, তখন তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে শহরটিকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন। তার এই অসামান্য অবদানের কথা মাথায় রেখে ১৮৯২ সালে প্রখ্যাত ভাস্কর জুলিয়েন ডিলেন্স এই শায়িত মূর্তিটি তৈরি করেন। এটি মূলত একটি স্মৃতিসৌধের অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। আজ থেকে প্রায় ১৩৪ বছর আগে যখন এটি স্থাপন করা হয়, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি যে একদিন এই শিল্পকর্মটি বিশ্বের অন্যতম ‘স্পর্শ করা’ বা ‘আদর করা’ ভাস্কর্যে পরিণত হবে। মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকেই এই মূর্তির সাথে আধুনিক ব্রাসেলসের আত্মিক যোগসূত্র তৈরি হয়।

লোকজ বিশ্বাসের উৎস ও বিবর্তন
মূর্তিটিকে হাত দিয়ে আদর করার বা স্পর্শ করার পেছনে ঠিক কবে থেকে এই বিশেষ বিশ্বাসটি শুরু হয়েছিল, তার কোনো লিখিত দলিল নেই। তবে গবেষকদের মতে, এটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পর্যটন প্রসারের সাথে সাথে তীব্রতর হয়। লোকমুখে প্রচলিত হয় যে, এই বীরের হাতের ওপর দিয়ে ওপর থেকে নিচের দিকে হাত বুলিয়ে দিলে সারাবছর ভালো কাটে এবং মানুষের মনোবাসনা পূর্ণ হয়। স্থানীয়দের মধ্যে আরেকটি বিশ্বাস প্রবল যে, এই মূর্তিতে হাত ছোঁয়ালে আপনি নিশ্চিতভাবে আবারও ব্রাসেলস ভ্রমণে আসার সুযোগ পাবেন। এই বিশ্বাসের কারণে মূর্তির ডান হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত অংশটি ঘর্ষণে সবচেয়ে বেশি চকচকে হয়ে উঠেছে। এছাড়া মূর্তির পায়ের কাছে থাকা একটি কুকুর ও দেবদূতের অবয়বকেও অনেকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে স্পর্শ করে থাকেন।

বীরত্ব ও কিংবদন্তির সংমিশ্রণ
এভারার্ড টি’সারক্লাসের এই জনপ্রিয়তার মূলে কেবল অন্ধ বিশ্বাস নয়, বরং তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধও কাজ করে। তিনি পাঁচবার ব্রাসেলসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে আসীন ছিলেন এবং শহরের কল্যাণে কাজ করেছেন। ১৩৮৮ সালে আততায়ীর হাতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বীরের প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই হয়তো মানুষ তাকে স্পর্শ করে তার সাহসের অংশীদার হতে চায়। মজার বিষয় হলো, মানুষের ক্রমাগত ঘর্ষণে আসল ব্রোঞ্জ ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বর্তমানে মূল মূর্তিটি সংরক্ষণশালায় রেখে তার স্থানে একটি অবিকল প্রতিরূপ রাখা হয়েছে। তবুও পর্যটকদের ভিড় কমেনি। ইতিহাস এবং লোকজ বিশ্বাসের এমন মেলবন্ধন ব্রাসেলসের এই বীরকে যুগের পর যুগ মানুষের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে।
ছবি: লেখক