ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হলো হজ। যেকোনো ইবাদতের কবুলিয়ত নির্ভর করে বিশুদ্ধ নিয়ত বা সংকল্পের ওপর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (বুখারি)। তাই হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত শুরুর আগে এর সঠিক পদ্ধতি ও সময় জেনে নেওয়া প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য আবশ্যক।
কখন নিয়ত করবেন? (সময় ও স্থান)
হজের নিয়ত মূলত ইহরামের সাথে সম্পৃক্ত। এটি নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়।
নির্ধারিত স্থান (মিকাত): হজযাত্রীদের মিকাত বা নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করার আগেই ইহরাম বেঁধে নিয়ত করতে হয়। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি মক্কাহগামী যাত্রীদের জন্য ‘ইয়ালামলাম’ হলো মিকাত। বিমানে থাকা অবস্থায় মিকাত অতিক্রমের আগেই ইহরাম পরিধান করে নিয়ত করা জরুরি।
হজের ধরণ অনুযায়ী সময়
হজে তামাত্তু: যারা প্রথমে ওমরাহ করেন, তারা মিকাত থেকে ওমরার নিয়ত করবেন। এরপর ৮ই জিলহজ মক্কাহ থেকে পুনরায় হজের নিয়ত করবেন।
হজে কিরান ও ইফরাদ: মিকাত থেকেই সরাসরি হজের নিয়ত করতে হয়।
হজের নিয়ত করার সঠিক পদ্ধতি
নিয়ত মূলত একটি মানসিক সংকল্প। অর্থাৎ মনে মনে এই ইচ্ছা করা যে, ‘আমি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজের কার্যাদি সম্পাদন করছি।’ তবে মনে মনে সংকল্পের পাশাপাশি মুখে উচ্চারণ করা সুন্নাত ও উত্তম।
হজের প্রকারভেদে নিয়তের বাক্যগুলো ভিন্ন হয়ে থাকে…
হজে তামাত্তু (ওমরাহ ও হজ পৃথকভাবে)
আমাদের দেশ থেকে অধিকাংশ মানুষ এই নিয়মে হজ করেন। এর নিয়ত হয় দুই ধাপে…
ওমরার জন্য (মিকাতে): ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ফায়াসসিরহা লি ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নি।’ (হে আল্লাহ! আমি ওমরার ইচ্ছা করছি, এটি আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন।)
হজের জন্য (৮ জিলহজ মক্কাহ থেকে): ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ফায়াসসিরহু লি ওয়া তাকাব্বালহু মিন্নি।’
হজে কিরান (একইসাথে হজ ও ওমরাহ)
‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল উমরাতা ওয়াল হাজ্জা ফায়াসসিরহুমা লি ওয়া তাকাব্বালহুমা মিন্নি।’
হজে ইফরাদ (শুধু হজ)
‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ফায়াসসিরহু লি ওয়া তাকাব্বালহু মিন্নি।’
তালবিয়া: নিয়তের পূর্ণতা ও ইহরাম শুরু
নিয়ত করার ঠিক পরপরই ‘তালবিয়া’ পাঠ করা আবশ্যক। তালবিয়া পাঠের মাধ্যমেই ইহরামের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় এবং হজের নিষিদ্ধ বিষয়গুলো কার্যকর হয়।
তালবিয়া: ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারিকা লাক।’
(পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচুস্বরে পাঠ করবেন)
মনে রাখার মতো জরুরি কিছু মাসয়ালা
ভাষা: আরবিতেই নিয়ত করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আপনি নিজের ভাষায় মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করলেই নিয়ত হয়ে যাবে।
স্মৃতিভ্রম: কেউ যদি মুখে নিয়ত বলতে ভুলে যান কিন্তু মনে হজের ইচ্ছা থাকে এবং তালবিয়া পাঠ করেন, তবে তার হজ বা ইহরাম শুদ্ধ হবে।
নারীদের বিশেষ অবস্থা: ঋতুস্রাব চলাকালীন নারীরা ইহরাম ও নিয়ত করতে পারবেন। এই অবস্থায় কেবল নামাজ ও কাবা শরীফ তওয়াফ বাদে হজের অন্য সব আমল (আরাফাত, মুজদালিফা ও মিনা) পালন করা যায়।
হজ কেবল একটি শারীরিক সফর নয়, বরং এটি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক আত্মিক যাত্রা। আপনার নিয়ত যদি হয় কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তবেই তা ‘হজে মা’বরুর’ বা কবুল হজ হিসেবে গণ্য হবে।