বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের অন্যতম নান্দনিক স্থান হলো মন্ট ডেস আর্টস বা শিল্পের পাহাড়। এই চত্বরে পা রাখলে দর্শনার্থীদের নজর কেড়ে নেয় একটি শ্বেতপাথরের গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাস্কর্য, যার নিচের বেদিতে সোনালী অক্ষরে খোদাই করা আছে কেবল একটি নাম, এলিজাবেথ। এটি মূলত বেলজিয়ামের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং দয়ালু রাণী এলিজাবেথ গ্যাব্রিয়েল ভ্যালেরি মেরি থেরেসা-এর স্মরণে নির্মিত। এই ভাস্কর্যটি কেবল একটি শৈল্পিক নিদর্শন নয়, বরং এটি বেলজিয়ামের জনগণের প্রতি একজন রাণীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিকূল সময়ে তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার এক নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
রাণী এলিজাবেথের শৈশব ও রাজকীয় জীবনের সূচনা
রাণী এলিজাবেথের জন্ম ১৮৭৬ সালে জার্মানির বাভারিয়ায়। তার পিতা ছিলেন বাভারিয়ার ডিউক চার্লস থিওডর, যিনি পেশায় একজন দক্ষ চোখের চিকিৎসক ছিলেন। রাজকীয় আভিজাত্যের মাঝে বড় হলেও পিতার মানবসেবামূলক কাজ তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯০০ সালে তিনি বেলজিয়ামের তৎকালীন রাজকুমার আলবার্টের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি পরবর্তীতে রাজা আলবার্ট ১ হিসেবে সিংহাসনে বোহন করেন। এলিজাবেথ যখন ১৯০৯ সালে বেলজিয়ামের রাণী হন, তখন থেকেই তিনি নিজেকে কেবল রাজপ্রাসাদের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেন। শিল্প, সাহিত্য এবং বিজ্ঞানের প্রতি তার ছিল অগাধ অনুরাগ, যা তাকে ইউরোপের সমসাময়িক রাজপরিবারগুলোর মধ্যে অনন্য করে তুলেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং সাদা কাপড়ের রাণী
বেলজিয়ামের ইতিহাসে রাণী এলিজাবেথকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার অসামান্য সাহসিকতার জন্য। ১৯১৪ সালে যখন জার্মানি বেলজিয়াম আক্রমণ করে, তখন অনেক রাজকীয় ব্যক্তিত্ব নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও এলিজাবেথ এবং রাজা আলবার্ট দেশ ছেড়ে যাননি। রাণী এলিজাবেথ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি নার্স হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং সম্মুখ সমরের কাছাকাছি ফিল্ড হাসপাতালে গিয়ে নিজ হাতে আহতদের সেবা করতেন। তার এই অকুতোভয় মানসিকতা এবং সাদা পোশাকে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিতির কারণে তাকে ভালোবেসে ‘হোয়াইট কুইন’ বা সাদা কাপড়ের রাণী বলা হতো। সৈন্যদের মনোবল বাড়াতে তার এই সরাসরি অংশগ্রহণ বেলজিয়ামের জাতীয় ইতিহাসে আজও অত্যন্ত গর্বের সাথে আলোচিত হয়।
শিল্প এবং বিজ্ঞানের অনন্য পৃষ্ঠপোষক
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাণী এলিজাবেথ বেলজিয়ামের সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত বন্ধু এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি ১৯৩৭ সালে বিখ্যাত ‘কুইন এলিজাবেথ কম্পিটিশন’ শুরু করেন, যা আজও বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সঙ্গীত প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও তিনি চিকিৎসা গবেষণার জন্য কুইন এলিজাবেথ মেডিকেল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রতিও তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল এবং ১৯২৩ সালে তিনি রাজা তুতানখামেনের সমাধি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, যা সেই সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ভাস্কর্যের শৈল্পিক গুরুত্ব ও মন্ট ডেস আর্টসের পরিবেশ
মন্ট ডেস আর্টস চত্বরে অবস্থিত রাণী এলিজাবেথের এই ভাস্কর্যটি ব্রাসেলসের স্থাপত্যশৈলীর এক চমৎকার উদাহরণ। ভাস্কর্যটিতে তাকে অত্যন্ত সৌম্য এবং মার্জিত রূপে চিত্রিত করা হয়েছে, যা তার ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য এবং মমতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই স্থানটি থেকে ব্রাসেলস শহরের প্যানোরামিক ভিউ বা বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে আধুনিকতার সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে। পর্যটকরা যখন এই চত্বরে ভ্রমণ করেন, তখন রাণী এলিজাবেথের এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তারা বেলজিয়ামের স্বর্ণালী ইতিহাস এবং একজন বিদুষী নারীর জীবনগাথা সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। ভাস্কর্যটি মূলত বেলজিয়ামবাসীর পক্ষ থেকে তাদের প্রিয় রাণীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি চিরস্থায়ী মাধ্যম।
প্রচ্ছদের ছবি: সংগৃহীত