জীবন এক অনিশ্চিত পথচলা যেখানে সাফল্যের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে অপ্রত্যাশিত পতনের বেদনা। আমরা প্রায়ই দেখি বিষণ্ণতা বা মানসিক অবসাদ আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই মানসিক যন্ত্রণার প্রকাশভঙ্গি সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। আমেরিকার ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে মানসিক কষ্ট লুকিয়ে রাখার প্রবণতা অনেক বেশি। এই নীরবতা কেবল একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা জটিল সমীকরণ।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ
গবেষণায় দেখা গেছে যে, পুরুষরা সাধারণত তাদের আবেগ নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। সমাজের বেঁধে দেওয়া ‘পুরুষত্ব’-এর সংজ্ঞায় আবেগপ্রবণ হওয়াকে অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করা হয়। ভার্জিনিয়া ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দাবি করেছেন, পুরুষরা তাদের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে নিজেদের অন্য কাজে ব্যস্ত রাখতে পছন্দ করেন, এমনকি সেই কাজ যদি ক্ষতিকরও হয়। তারা একা বসে নিজের চিন্তার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে বাইরের কোনো কাজে ডুবে থেকে কষ্ট ভুলতে চান। এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই দীর্ঘমেয়াদী অবসাদের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জমে থাকা কষ্টের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
দীর্ঘদিন ধরে মনের কষ্ট চেপে রাখার ফলে তা কেবল মানসিকভাবে নয়, শারীরিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুরুষদের মধ্যে এই চেপে রাখা কষ্ট অনেক সময় খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের ব্যাঘাত কিংবা হুটহাট রেগে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেহেতু তারা সহজে চোখের জল ফেলতে পারেন না বা কাছের মানুষের কাছে মন খুলে কথা বলতে দ্বিধা করেন, তাই তাদের ভেতরের শূন্যতা আরও ঘনীভূত হয়। এই মানসিক দেয়াল কেবল তাদের নিজেদের ক্ষতি করে না, বরং পরিবারের সাথে তাদের দূরত্বের সৃষ্টি করে।
জীবনের ছন্দে ফেরার সহজ উপায়
মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হবে যে সাহায্য চাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। নিজেকে একটু সময় দেওয়া এবং নিজের শখের কাজগুলোতে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। প্রতিদিন নিয়ম করে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা বা প্রিয় কোনো গান শোনা মনের ভার অনেকটা লাঘব করতে পারে। যদি একান্তই কারো সাথে কথা বলতে সংকোচ হয়, তবে নিজের অনুভূতিগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, নিজের মনের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার একটি প্রয়োজনীয় অংশ।
সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া
আমাদের চারপাশে থাকা পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের আরও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। বন্ধু, স্বামী বা বাবা—যিনিই হোক না কেন, তাদের কথা মন দিয়ে শোনার একটি পরিবেশ তৈরি করা উচিত। অনেক সময় কোনো সমাধান না দিয়ে কেবল ‘আমি তোমার পাশে আছি’ এই বাক্যটিই কারো জীবন বদলে দিতে পারে। মনের জমানো পাথর সরিয়ে দিতে পারলে জীবন আবার নতুন ছন্দে ফিরে আসবে। দিনের শেষে আমরা সবাই মানুষ, আর প্রতিটি মানুষেরই অধিকার আছে তার কষ্টের কথাটুকু ভাগ করে নেওয়ার।