Thursday 26 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

একটুতেই ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন?

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪২

আমাদের চারপাশের চেনা জগতে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের মনটা ঠিক কাঁচের আয়নার মতো স্বচ্ছ আর সংবেদনশীল। এক ফালি রোদে যেমন তারা হাসেন, তেমনি সামান্য মেঘ দেখলেই তাদের মনে বিষাদ ভর করে। কারো একটু কড়া কথা, প্রিয়জনের মেসেজের দেরিতে আসা উত্তর কিংবা তুচ্ছ কোনো অবহেলা তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। আপনিও যদি এমন কেউ হন যার সারাদিনের মেজাজ নির্ভর করে অন্যের সামান্য আচরণের ওপর, তবে এই ফিচারটি আপনারই জন্য।

কাঁচের মতো নরম মন ও অনুভূতির ভার

আবেগী হওয়া কোনো অপরাধ নয়, বরং এটি মানুষের মানবিক গুণেরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু যখন এই আবেগ আপনার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অন্যের হাতে চলে যায়, তখনই শুরু হয় আসল সমস্যা। কারো উঁচু গলার একটা ধমক বা তুচ্ছ কোনো সমালোচনা যখন আপনার পুরো দিনটাকে বিষিয়ে তোলে, তখন বুঝতে হবে আপনার মনের নিয়ন্ত্রণ চাবিটি আপনার কাছে নেই। এই ধরনের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা আপনাকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে দেয় এবং আপনি নিজের অজান্তেই এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে পড়েন।

বিজ্ঞাপন

মেসেজের নীল টিক আর অপেক্ষার যন্ত্রণা

ডিজিটাল যুগে আমাদের আবেগগুলো এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আটকে গেছে। প্রিয় মানুষটির মেসেজ সিন হয়ে পড়ে থাকা অথচ রিপ্লাই না আসা আপনার মনে যে অস্থিরতা তৈরি করে, তা কেবল একজন অতি-আবেগী মানুষই বোঝেন। এই যে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে অতিমাত্রায় চিন্তা করা বা ‘ওভারথিংকিং’, এটি আপনার মানসিক প্রশান্তি নষ্ট করার অন্যতম কারণ। আপনি যখন অন্যের কাজের ব্যবচ্ছেদ করতে বসেন, তখন নিজের অজান্তেই নিজের আত্মবিশ্বাসকে আঘাত করেন।

কটু কথা যখন বিষের মতো কাজ করে

কেউ হয়তো রাগের মাথায় বা নিজের খারাপ মেজাজের কারণে আপনাকে দুটি কটু কথা শুনিয়ে দিল। একজন সাধারণ মানুষ হয়তো সেটা শুনে ভুলে যাবেন, কিন্তু আপনার মতো ইমোশনাল মানুষের কাছে সেটা হয়ে ওঠে এক মরণঘাতি বিষ। আপনি বারবার সেই কথাগুলো মনে মনে আওড়াতে থাকেন এবং নিজের ওপর দোষ চাপাতে শুরু করেন। এতে করে আপনার সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং আপনি কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে পিছিয়ে পড়েন। অন্যের নেতিবাচকতাকে নিজের ভেতরে লালন করা আসলে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি।

নিজের অজান্তেই নিজের ক্ষতি করা

অতিরিক্ত আবেগের কারণে আপনি যখন সবকিছু ব্যক্তিগতভাবে নিতে শুরু করেন, তখন আপনার বিচারবুদ্ধি লোপ পেতে থাকে। সামান্য মনমালিন্যে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা বা অভিমানে নিজেকে গুটিয়ে রাখা আপনার সামাজিক সম্পর্কগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দিনের পর দিন এমন চলতে থাকলে এটি স্ট্রেস, উদ্বেগ এবং দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতার দিকে ধাবিত করতে পারে। নিজের সুখের চাবিকাঠি যখন অন্যের হাতে তুলে দেন, তখন আপনার নিজের অস্তিত্ব যেন ফিকে হয়ে আসে।

অতিরিক্ত আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার কিছু কার্যকরী কৌশল

অতিরিক্ত আবেগ বা সেনসিটিভিটি যখন আপনার মানসিক শান্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। এটি কোনো রাতারাতি ঘটা অলৌকিক পরিবর্তন নয়, বরং প্রতিদিনের অভ্যাসের মাধ্যমে নিজের মনকে প্রশিক্ষিত করা। অতিরিক্ত ইমোশনাল ওভারলোড সামলানোর কিছু কার্যকর জীবনমুখী কৌশল নিচে তুলে ধরা হলো…

আবেগের লাগাম ধরার পথ

জীবনটা আপনার, তাই এর প্রতিটি মুহূর্তের মালিকানা আপনারই থাকা উচিত। অন্যের আচরণ আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু সেই আচরণে আপনি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা সম্পূর্ণ আপনার হাতে। কেউ খারাপ কথা বললে বা মেসেজের উত্তর না দিলে সেটা যে তার ব্যক্তিগত সমস্যা বা ব্যস্ততা হতে পারে, এই সহজ সত্যটি গ্রহণ করতে শিখুন। নিজেকে ভালোবাসতে শুরু করলে এবং নিজের কর্মব্যস্ততা বাড়ালে অন্যের ছোটখাটো বিষয়গুলো আর আপনাকে বিচলিত করতে পারবে না। মনে রাখবেন, আপনার প্রশান্তি আপনারই দায়িত্ব।

নিজের মনের রাজা হওয়া

আবেগ থাকবেই, তবে তাকে হতে হবে আপনার শক্তির উৎস, দুর্বলতা নয়। যেদিন থেকে আপনি অন্যের কটু কথাকে বাতাসের মতো উড়িয়ে দিতে শিখবেন, সেদিন থেকেই আপনি প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন। জীবন খুব ছোট, তাই অন্যের দেওয়া সামান্য অবহেলায় নিজের মূল্যবান দিনটি নষ্ট করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজের ভেতরের সেই শান্ত আর স্থির মানুষটিকে খুঁজে বের করুন, যে জানে কখন পাত্তা দিতে হয় আর কখন মুচকি হেসে এগিয়ে যেতে হয়।

প্রতিক্রিয়ার আগে বিরতি নেওয়ার শিল্প

যখন কেউ আপনাকে কটু কথা বলে বা আপনার মনের মতো আচরণ করে না, তখন সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। আমাদের মস্তিষ্ক আবেগের বশবর্তী হয়ে দ্রুত উত্তর দিতে চায়, যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। নিজেকে অন্তত দশ সেকেন্ড সময় দিন। এই ছোট্ট বিরতিটি আপনার যুক্তি বা ‘লজিক্যাল ব্রেন’কে সক্রিয় হতে সাহায্য করবে। গভীর শ্বাস নিন এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই বিষয়টি কি এক সপ্তাহ পর আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে সেই মুহূর্তে চুপ থাকাই শ্রেয়।

অন্যের আচরণকে ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়া

সবচেয়ে বড় ভুল যা আমরা করি তা হলো অন্যের খারাপ মেজাজ বা অবহেলাকে নিজের দোষ বলে ধরে নেওয়া। মনে রাখবেন, কেউ যদি আপনাকে দেরিতে রিপ্লাই দেয় বা উঁচু গলায় কথা বলে, তবে সেটি তার রুচি, তার ব্যস্ততা বা তার চারিত্রিক সমস্যার প্রতিফলন, আপনার নয়। ডন মিগুয়েল রুইজের একটি বিখ্যাত সূত্র হলো—’নেভার টেক এনিথিং পার্সোনালি’। মানুষ যা বলে বা করে তা তাদের নিজস্ব জগতের প্রজেকশন। এটি মনে রাখলে অন্যের নেতিবাচক কথা আপনার হৃদয়ে দাগ কাটতে পারবে না।

প্রত্যাশার পারদ নিচে নামানো

আমাদের অধিকাংশ কষ্টের মূল কারণ হলো অন্যের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করা। আমরা ভাবি, আমি যেমন সবার সাথে ভালো ব্যবহার করি, সবাই আমার সাথে তেমনই করবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পৃথিবীটা নিখুঁত নয় এবং মানুষও সবসময় আপনার মনের মতো হবে না। যখন আপনি মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্তির আশা কমিয়ে দেবেন, তখন তাদের ছোটখাটো ভুলগুলো আপনাকে আর আগের মতো আঘাত করবে না। নিজের সুখের উৎস অন্যের আচরণের বদলে নিজের কাজের মধ্যে খুঁজে নিন।

ডিজিটাল ডিটক্স ও সীমানা নির্ধারণ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের আবেগকে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ করে। কারো স্ট্যাটাস দেখে বা মেসেজ সিনের অপেক্ষায় থেকে মনের শান্তি নষ্ট করবেন না। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফোন দূরে রাখুন। এছাড়া আপনার জীবনে একটি সীমানা বা ‘বাউন্ডারি’ তৈরি করুন। যারা আপনার আবেগকে মূল্যায়ন করে না বা আপনাকে ছোট করে কথা বলে, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। সবাইকে খুশি করার দায়িত্ব আপনার নয়, এই সত্যটি যত দ্রুত গ্রহণ করবেন, জীবন তত সহজ হবে।

মনকে ডায়েরিতে বন্দি করা

যখনই খুব বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বেন বা অস্থিরতা লাগবে, তখন মনের কথাগুলো একটি ডায়েরিতে লিখে ফেলুন। লিখে ফেলার পর দেখবেন আপনার ভেতরের সেই ভারি ভাবটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। এটি আপনাকে নিজের আবেগের ধরণ বুঝতে সাহায্য করবে। আপনি যখন লেখাগুলো পরে পড়বেন, তখন নিজেই বুঝতে পারবেন কোন বিষয়গুলো আসলে পাত্তা দেওয়ার মতো ছিল না। এই স্ব-সচেতনতা আপনাকে ভবিষ্যতে আরও ধীরস্থির হতে সাহায্য করবে।

আত্মপ্রেম বা সেলফ-কেয়ারের চর্চা

নিজেকে ভালোবাসার অর্থ হলো নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট এমন কিছু করুন যা আপনাকে আনন্দ দেয়— তা হতে পারে বই পড়া, গান শোনা বা স্রেফ চুপচাপ হাঁটা। নিজের সাথে সময় কাটালে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যখন আপনি ভেতর থেকে শক্তিশালী হবেন, তখন বাইরের জগতের কোনো সামান্য তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আপনার মনের দুর্গে ফাটল ধরাতে পারবে না। নিজেকে বলুন, ‘আমি অন্যের মন্তব্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।’

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

একটুতেই ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন?
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪২

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর