Saturday 05 Apr 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

যাত্রী

জুঁই মনি দাশ
১৪ মে ২০২১ ১৭:২৯

বাসটা থামতেই ঢাকার গায়ের চেনা গন্ধটা ঋতুকে সাদরে অভিবাদন জানিয়ে গেল। টঙ্গী পার হয়ে আবদুল্লাহপুর ব্রিজের উপর বাসগুলো সারিবদ্ধ সমাবেশে স্থানু হয়ে আছে। এটা নতুন কিছু না, যারা এই পথে যাতায়াত করে তারা এই সারিবদ্ধ স্থানু সমাবেশ দেখে অভ্যস্ত।ঋতু মাসে দু’তিনবার বাড়ি যায়। প্রতিবার প্রায় একই দৃশ্য চোখে পড়ে। তবুও কেন যেন দেখতে ভালো লাগে।এই যে ব্রিজের রেলিংয়ের উপর বা ফুটপাতের উপর আদা, রসুন, পেঁয়াজ, কাঁচা হলুদ, লেবু, সবজি, পাঁপড় ভাজি, বুট-বাদাম নিয়ে দোকানিরা বসে আছে এটা আসলে একটা স্থিরচিত্র।বাসের ভেতর থেকে দেখলে আতঙ্ক হয়, ঋতুর মনে হয় রেলিংয়ে বসা লোকগুলো একটু অসাবধান হলেই বিশ-পঁচিশ ফুট নিচে পড়ে যাবে। কিন্তু তারা এত সাবলীল হাসি নিয়ে বসে থাকে যে মনে হয় ভয় বা আতঙ্কের কিছু নেই। প্রতিদিনের অভ্যস্ততা অস্বাভাবিক কিছুকেও স্বাভাবিক করে তোলে। কোন দুর্ঘটনার খবর ঋতুর জানা নেই তবুও এই ব্রিজটা পার হওয়ার সময় তার মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করে।

বিজ্ঞাপন

ঋতুও ব্রিজের রেলিংয়ের মতো অনিরাপদ জায়গায় বসে ঢাকার জীবনটা যাপন করে। ওর মফস্বলের প্রতিবেশি, আত্মীয়স্বজন, স্কুল-কলেজের বন্ধুবান্ধব এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরাও মনে করে সে যেকোন সময় বিশ ফুট নীচের খাদে পড়ে যাবে। এই যে, ঋতুর পাশে যে মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বসে আছেন তিনিও সেই অনিশ্চয়তা নিয়ে গোটাপথে বারবার আড় চোখে বিঁধেছেন। ময়মনসিংহের মাসকান্দার ঢাকা বাসস্ট্যান্ডে টিকিট নিয়ে বাসে বসার পর থেকেই ভদ্রলোক আগ্রহ নিয়ে তাকে দেখছিলেন। এমনিতে আগ্রহ নিয়ে দেখার মতো বিশেষ কিছু ঋতুর গড়নে নেই বরং বড্ড বেশি সাদামাটা বলেই সবাই একটু আলাদা করে খেয়াল করে।ঋতু বাসে উঠেই সাধারণত মোবাইল ফোনে গান শুনতে শুরু করে, কানে হেডফোন লাগিয়ে পাশের সিটের যাত্রীর সাথে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করে। কিন্তু আজ মোবাইল ফোনে চার্জ না থাকায় ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে জানালার দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে থাকার চেষ্টা করছিলো।ঘুম আসছে না তাই সে একটা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

অনেকক্ষণ উশখুশ করার পর ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করেন, আপনার বাসা কোথায়? ঋতু না শোনার ভান করে পড়তে থাকে। ভদ্রলোক একটু থেমে বলেন, আমার বাসা সানকিপাড়া। আপনার? এবার এড়ানো গেল না, ঋতু নির্লিপ্তস্বরে বলে, আমার বাসা ময়মনসিংহ শহরে না, ঈশ্বরগঞ্জে। তবে এখন হোটেল আমির ইন্টারন্যাশনাল থেকে এসেছি। ভদ্রলোক একটু দমে গিয়ে প্রায় আর্তনাদের সুরে বললেন, হোটেলে কেন?

অফিসের কাজে এসেছিলাম, আমি খুব ক্লান্ত একটু ঘুমাতে চাই, বলে ঋতু। খুব অসন্তুষ্ট হয়ে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন।

ত্রিশাল পার হতেই জিজ্ঞেস করলেন, পৌঁছতে তো বোধহয় কম করে রাত আটটা বাজবে, কি বলেন? ঋতু হাই তোলে বলল, বোধহয় আরও বেশি বাজবে, গাজীপুর চৌরাস্তায় যে জ্যাম থাকে।

ঢাকায় কোথায় থাকেন?

আজিমপুর।

ও, পরিবারের সাথে।

না, সাবলেট থাকি।

ভদ্রলোক বিগলিত হাসি দিয়ে বললেন, আপনি তো খুব সাহসী। আমি সাহসী মেয়েদের খুব পছন্দ করি। আমার ওয়াইফও ইডেনের ছাত্রী। আমি মিজানুর রহমান। আনন্দমোহন কলেজে শিক্ষকতা করি। বউ ছেলেমেয়ে ঢাকায় থাকে, তাই আমার ঢাকা-ময়মনসিংহ করেই দিন কাটে। আমি একাই কথা বলে যাচ্ছি, আপনার নাম কি?

ঋতু তাবাসসুম, ঢাকা শহরে চাকরি খুঁজি। এখন একটা এনজিওতে চাকরি করি।ডোনারদের নিয়ে ফিল্ড ভিজিটে এসেছিলাম। আমি দরিদ্র আর আমার চারপাশ কতটা দরিদ্র সেটা বর্ণনা করাই আমার কাজ।

ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন, এটা ভালো বলেছেন। আমিও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দারিদ্র্য কেনাবেচার হাটে ছিলাম। সোশিওলজির ছাত্র বুঝতেই পারছেন শিক্ষকতা না করলে সামনে পড়ে থাকে এনজিও, যার গালভরা নাম ডেভেলপমেন্ট সেক্টর।

একটু আগে মিজানুর রহমান ঋতুর প্রায় গা ঘেঁষে বসেছিলেন। গায়ে গা না লেগে থাকলেও ঋতুর অস্বস্তি হচ্ছিল। এখন বেশ সহজ হয়ে স্বভাবিক দূরত্ব বজায় রেখে বসলেন। একটু আগে উনার চোখগুলো ঋতুকে ইতস্তত পর্যবেক্ষণ করছিল, এখন চোখগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেমিকের চোখের মতো টলটলে। মানুষের শরীরি ভাষা মুখের ভাষার চেয়ে শক্তিশালী। আমরা যা ভাবি অধিকাংশ সময় তা বলি না। ব্যক্তি, পরিবেশ, অবস্থান অনুযায়ী তা প্রকাশ করি। কিন্তু শরীরি ভাষা আমাদের আদিম অনুভূতির বাটখারা, এখানে লুকোচুরির কোনও সুযোগ নেই।

চশমাটা হাতে নিয়ে মিজানুর রহমান বললেন, গত বিশ বছরে তাহলে দারিদ্র্যের হাটের বিশেষ কোনও পরির্বতন হয়নি, কি বলেন?

না, তা কেন, আর্থিকভাবে মানুষ স্বচ্ছল হয়েছে। তাই এখন কিশোর-কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্য, প্রতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক পর্যায়ের যৌন নির্যাতন নিয়ে কাজ করতে পারছি।

আপনাকে ঋতু বলতে পারি?

হুমম, কেন নয়।

পরিবর্তন অনেক হয়েছে, আমার মেয়ে ছায়ানটের নালন্দা স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ওর ভাবনাচিন্তা অনেকসময় আমি ধরতে পারি না। ওর একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে।গিটারে গান বাঁধছে, কোথাও ঘুরতে গেল বা সমসাময়িক ইস্যু নিয়ে ভিডিও তৈরি করে আপ করছে। এসব নিয়েই তার জগৎ। আমার কৈশোরের সাথে কোনও মিল নেই।

মেয়ের নাম কি?

সুচিস্মিতা সূর্য। আমরা সূর্য বলেই ডাকি।

বাহ! বেশ সুন্দর নাম তো। একে তো বাংলা নাম আজকাল কেউ রাখে না, তার ওপর সূর্য নামটা মেয়েদের কখনও শুনিনি।

হুমম, এই নাম নিয়ে অনেক ঝামেলা। আমার আব্বা-আম্মা পছন্দ করেন না। উনারা সুবাইতা ডাকেন। আমার বউয়ের কিছু ব্যাপারে একগুঁয়েমি আছে, এই নামকরণ তার একটা।

ঋতু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, ভাবী কী করেন?

ওর একটা বুটিক আছে, এখন ছোট আকারে হোম ডেলিভারি খাবারের ব্যবসা শুরু করেছে।

ভাল, বেশ ভাল। নিজে কিছু করার মতো আনন্দের কিছু নেই। আপনি নামবেন কোথায়?

মিজানুর রহমান উত্তর দিলেন, মহাখালী। আপনি?

এয়ারর্পোট, বাসে উঠতে সুবিধা হয়।

ওহ।

গাজীপুর চৌরাস্তা পার হতেই জ্যাম শুরু হল। ঋতু ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙল ঢাকার গন্ধে।মোবাইল টিপে দেখল, আটটা বেজে গেছে। রাত দশটার মধ্যে কি পৌঁছানো যাবে? না হলে আবার আঙ্কেল-আন্টির একশটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। এক সপ্তাহ ধরে রুমে নেই, রুমটার কী অবস্থা কে জানে! মারিয়া নিশ্চয়ই আজকের রাতটা পার করে দেবে কিছু একটা রান্না করে। এই প্রকাণ্ড শহরে মারিয়া ছাড়া এই মুহূর্তে আর কারও ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই।

বাসের হেল্পার ডাকছে, এয়ারপোর্টের যাত্রীরা সামনে আসেন।যে জ্যাম আরও পনেরো মিনিট লাগবে।বেচারাও গন্তব্যের জন্য অস্থির হয়ে আগে থেকেই ডাকতে থাকে।

বাড়ির জন্য ঋতুর মন খারাপ লাগছে। কাল শুক্রবার, এত কাছে এসেও বাড়ি যেতে পারল না। আগামীকাল সকাল দশটায় ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা। গত তিন বছরের অধিকাংশ শুক্রবারগুলো নিয়োগ পরীক্ষার খাতে ব্যয় হয়েছে। একজন এনজিওকর্মীর কাঙ্ক্ষিত সাপ্তাহিক ছুটির দিন কী অর্থহীন প্রচেষ্টায় কেটে যায়।

মিজানুর রহমান বারবার ঘড়ি দেখছেন।ঋতু জিজ্ঞেস করে, আপনার বাসা কোথায় জানা হল না।

লালমাটিয়া।ঋতুর দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনি ফেসবুকে আছেন? থাকলে যোগাযোগ হতে পারে।

নাই, বলাটা হাস্যকর।তাই আইডি বিনিময় হলো।ঋতুর চক্রব্যূহের মধ্যে সে নিজেই ঢুকতে পারে না সেখানে ভার্চুয়াল জগতের মুখ বা মুখোশের সুযোগ কতটুকু?

এয়ারপোর্ট এসে গেছে। ঋতু বিদায় নিয়ে নেমে পড়ল।

পেট্রোল-ডিজেল আর শ্রমিকের ঘামের গন্ধের ঢাকা। এখানে মাথায় ওড়না পরা গার্মেন্টসকর্মী বা কর্পোরেট শ্রমদাস সবাই সমান। এদের শ্রম, ঘাম, কাম নিংড়ে নিয়েই তৈরি হয়েছে এই শহরের কঙ্কাল। উপরে যে আলোর চটক সেটা রাতের যৌনকর্মীর মুখের প্রসাধনের মতো তীব্র আর কর্পোরেট শ্রমদাসদের চোখের মতো করুণ। এই দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা শহরে কারও থেমে থাকার উপায় নেই।

ঋতু আজিমপুরের বাসে পা রাখতেই মফস্বলের গন্ধটা পুরোপুরি কেটে গেল। আব্বুর কল মোবাইলে বাজছে কিন্তু ঋতুর ভীষণ কান্না পাচ্ছে। এসব লোকাল বাসে কাঁদতে নেই। এই লোকাল বাসগুলোও ঋতুর সাবলেট বাসার মতো, যেখানে কোনো প্রাইভেসি নেই।

সারাবাংলা/এসএসএস

ছোটগল্প জুঁই মনি দাশ টপ নিউজ যাত্রী

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর