Sunday 04 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বিচার চাইতে গিয়ে ‘অবিচারের শিকার’ প্রবাসী হাসান!

জুলফিকার তাজুল, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫০ | আপডেট: ৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:০৯

আমেরিকা প্রবাসী হাসান আহমেদ। ছবি: সারাবাংলা

সিলেট: আমেরিকা প্রবাসী হাসান আহমেদ (সিলটি হাসান নামে পরিচিত)—যিনি বিদেশের বিলাসী জীবন, আরামদায়ক ক্যারিয়ার ও নিরাপদ ভবিষ্যৎকে পেছনে ফেলে শুধু শিকড়ের টানে দেশে ফিরে করেছেন বড় অংকের বিনিয়োগ। কিন্তু পুলিশি হয়রানিতে তিনি এখন অতিষ্ঠ। অভিযোগ উঠেছে, চুরির বিচার চাইতে গিয়ে উলটো নিজেই অবিচারের শিকার হচ্ছেন । এতে নিরাপত্তাহীন হওয়ার পাশাপাশি চরম মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। এমনকি হুমকির মুখে সারা জীবনের অর্জিত টাকায় দেশে করা স্বপ্নের বাড়ি।

প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা, হারিয়ে যাওয়া সিলেটি ঐতিহ্য সংরক্ষণের নেশা ও শিকড়ের প্রতি মমত্ববোধ তাকে প্রলুব্ধ করেছে একটি বাড়ি নির্মাণের। মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখার উপজেলার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের কাশেমনগর গ্রামের পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির কোলে তিনি নির্মাণ করেছেন এক দৃষ্টিনন্দন বাড়ি, যেখানে আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যা ও প্রাচীন ঐতিহ্যের ছোঁয়া মিলেমিশে এক অদ্বিতীয় রূপ ধারণ করেছে। চারদিকে ঢালু ‘স্লোপিং ডিজাইন’ এবং জাপানিজ বা প্যাগোডা ঘরানার ছাপ থাকা এই বাড়ি শুধু একটি বাসস্থান নয়—এটি হাসানের স্বপ্ন, শিল্পবোধ ও দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সেই স্বপ্নই আজ তার জন্য দুঃস্বপ্নে রূপ নিয়েছে। চুরির অভিযোগ জানাতে গিয়ে তিনি পুলিশের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ১২ লাখ টাকার চাঁদাবাজি, এবং মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী সম্পদ লুটের মুখোমুখি হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আমেরিকার আলো-ঝলমলে জীবন ছাড়ার পর নিজের দেশে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটানো এই প্রবাসীর গল্প এখন কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি দেশের আইন, ন্যায়বিচার ও প্রবাসী উদ্যোগের প্রতি প্রশ্ন তুলেছে।

জানা গেছে, ১৩ নভেম্বর রাতে হাসান আহমেদের অনুপস্থিতিতে তার বড়লেখার বাড়িতে সংঘটিত হয় দুর্ধর্ষ চুরি। এতে নগদ পাঁচ লাখ টাকাসহ প্রায় ৩৬ লাখ টাকার মালামাল খোয়া যায়। চুরির ঘটনায় মামলা করতে গেলে শুরু থেকেই পুলিশের অসহযোগিতা লক্ষ্য করেন তিনি। চুরির অভিযোগ জানাতে থানায় গিয়ে উলটো পুলিশের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ১২ লাখ টাকা চাঁদাবাজি এবং মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী সম্পদ লুটের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

হাসানের আলোচিত বাড়ি। ছবি: সারাবাংলা

হাসানের আলোচিত বাড়ি। ছবি: সারাবাংলা

আমেরিকা প্রবাসী হাসান সারাবাংলাকে জানান, মামলার তদন্তের কথা বলে ২১ নভেম্বর দিবাগত রাতে অ্যাডিশনাল এসপি (কুলাউড়া সার্কেল) আজমল হোসেন ও উপপরিদর্শ (এসআই) সুব্রত তার বাড়িতে আসেন। এসে ঘর সার্চ করার নামে ওই রাতে পুলিশ শুধু তার ব্যবহৃত আইফোন জব্দ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং ৫ লাখ টাকা মূল্যের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মের দু’টি আর্চারি সেট (তীর-ধনুক) সঙ্গে করে নিয়ে যান। একই সময় তার ব্যক্তিগত কথোপকথন ও পারিবারিক ছবি ঘেঁটে এক পর্যায়ে ১২ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে সারা জীবন জেলে রাখার হুমকি দেওয়া হয়।

হাসানের দাবি, চাঁদাবাজির বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার আমেরিকা প্রবাসী মা জেসমিন আক্তারকেও ফোন করে অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা হয়। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি দু’দফায় ছয় লাখ দেন। ১২ লাখ টাকার মধ্যে নগদ এক লাখ টাকা এবং ৫ লাখ টাকার একটি চেক স্থানীয় ইকবাল চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পুলিশ নেয় বলে জানান হাসান। যদিও পরবর্তী সময়ে সেনা ক্যাম্পের হস্তক্ষেপে নগদ অর্থ ও চেক ফেরত দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।

এখানেই শেষ নয় পুলিশের অত্যাচার। এক পর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হলেও কথিত ভুয়া বিভিন্ন ফেইসবুক পেইজ থেকে তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা অভিযোগ তুলে কুৎসা রটানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। তার বাড়ির সামনে ভাড়াটে লোক এনে মিছিল করানো হয় বিচারের দাবিতে। এটাকে পুঁজি করে কয়েকটি গণমাধ্যমে নিউজও হয় বলে জানা গেছে। এর পর হাসানের বিরুদ্ধে জায়গা দখলের অভিযোগ তোলা হয় ।

এই প্রতিবেদকের সামনেও পুলিশ সুপারকে (এসপি) জমি দখলের বিষয়েও বলেন অভিযুক্ত এএসপি আজমল। তখন এসপি বলেন, ‘এটি আপনাদের বিষয় নয়।’ এর পর এএসপি আজমল বলেন, হাসানের বাসায় সেক্স টয় পাওয়া গেছে। তিনি টিলা কেটে মাটি বিক্রি করেন। ভারত থেকে গরু বাংলাদেশে এনে বিক্রি করে এবং তার বাসায় নারী পুরুষের অবাধ বিচরণসহ রয়েছে নানান অভিযোগ।

কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। উলটো তারা সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাসান একজন সহজ সরল মানুষ। এরকম কিছু হলে তো আগে আমরা দেখতাম এবং অভিযোগ করতাম। পুরোটাই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এবং চুরির অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বাঁচাতে এগুলো পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে।’

এদিকে হাসানের বাসায় চুরির ঘটনায় যাকে অভিযুক্ত করে হাসান মামলা করেছিলেন, রহস্যজনকভাবে পুলিশ সেই আনোয়ারের (হাসানের বাড়ির সাবেক কেয়ারটেকার) নাম মামলা থেকে বাদ দেয়। উলটো তার বাড়িতে কর্মরত একজন নিরীহ কর্মচারীকে মামলায় ফাঁসানোর জন্য গভীর রাতে ধরে এনে রাতভর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

আমেরিকা প্রবাসী হাসান আহমেদ। ছবি: সারাবাংলা

আমেরিকা প্রবাসী হাসান আহমেদ। ছবি: সারাবাংলা

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসান আহমেদ একজন লেখক, নৃত্যশিল্পী ও ঐতিহ্য সংগ্রাহক। তিনি ইংরেজির পাশাপাশি সিলেটি নাগরী, অহমিয়া ও মণিপুরী ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন এবং সিলেটি নাগরী ভাষায় বইও লিখেছেন। একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এলাকার মানুষজন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন।

স্থানীয় একটি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা এমরান আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখে তারা বাড়িটি দেখতে এসেছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তা সত্য নয়। চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত আনোয়ারকে রক্ষায় একটি নাটক সাজানো হয়েছে। আমরা এলাকায় থেকে যা জানি না, তা কেউ বিদেশে বসে বা থানায় থেকে জেনে যান কীভাবে। যদি তিনি অভিযুক্তও হন নিশ্চয় তার বিচার হবে। কিন্তু মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কাউকে হয়রানি বা নির্যাতন করা ঠিক নয়।’

অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি জানতে বড়লেখা থানার এসআই সুব্রত চন্দ্র দাসের মুখোমুখি হলে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। উলটো সাংবাদিকদের তার রুমে বসিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। প্রায় দেড় ঘণ্টা তার অফিসে অপেক্ষা করার পরও তিনি আসেননি, এমনকি ফোনও ধরেননি।

১২ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগসহ হয়রানির বিষয়ে কুলাউড়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) আজমল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সারাবাংলাকেবলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। একজন মানুষ অভিযোগ করতেই পারেন। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন, তাদের কাছে প্রমাণ উপস্থাপন করলে তারা যাচাই-বাছাই করে দেখবেন।’

প্রবাসী হাসানের ৫ লাখ টাকার আর্চারি (তীর-ধনুক) নেওয়ার অভিযোগের বিষয়েও তিনি বলেন, ‘ওটা সিজার লিস্ট অনুযায়ী সিজ করা হয়েছে এবং জিডিতে নোট দেওয়া রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যা কিছু করা হয়েছে সবই এক্সপার্ট আইনের মধ্যে থেকে করা।’ এর বাইরে আর কোনো মন্তব্য নেই বলেও জানান তিনি।

অপরদিকে মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা প্রবাসী হাসানের অভিযোগ বিষয়ে এরই মধ্যে অবগত হয়েছি। তিনি একটি অভিযোগ পুলিশ সুপার বরাবর জমা দিয়েছেন। উনার দেওয়া অভিযোগগুলো আমরা খতিয়ে দেখব। যারা মূল অপরাধী তাদের খুঁজে বের করব।’

এ ছাড়া, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।