ঢাকা: প্রাইমারি শিক্ষার মানোয়ন্নে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় নিয়োগ হতে যাচ্ছে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। এ উপলক্ষ্যে ৯ জানুয়ারি বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে লিখিত পরীক্ষা। ১৪ হাজার ৩৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৮০ জন চাকরিপ্রার্থী এবারের পরীক্ষায় অংশ নিতে যাচ্ছেন। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে আগে থেকেই রয়েছে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ। এবার সেখানে যোগ হয়েছে নতুন ফর্মুলা ‘ডিভাইস কারসাজি’।
গত ৭ জানুয়ারি ‘প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ/২০ লাখ টাকায় চাকরির চুক্তি, পরীক্ষা ডিভাইসে’- এই শিরোনামে সারাবাংলা ডটনেটে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর পরই সারাদেশে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ডিভাইস পার্টিসহ প্রতারকদের ধরতে চলছে ডিবি পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। এ ছাড়া, পরীক্ষা কেন্দ্রেও আনা হয়েছে কিছু পরিবর্তন।
৯ জানুয়ারি বিকেলের নিয়োগ পরীক্ষা উপলক্ষ্যে এরই মধ্যে সবপ্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে সবধরনের পদক্ষেপ। ঢেলে সাজানো হয়েছে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলো। যারা পরীক্ষা নেবেন তাদের এদিন দুপুরের মধ্যে কেন্দ্রে হাজির থাকতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোতে একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর তদারকিতে থাকবেন জেলা প্রশাসক নিজেই।
জানা গেছে, এবার রঙিন প্রবেশপত্রের সঙ্গে প্রার্থীর নিজ এনআইডি অথবা স্মার্টকার্ড আনতে হবে। আগে শুধুমাত্র রঙিন প্রবেশপত্র সঙ্গে আনতে হতো। এবারের পরীক্ষার সময় পরীক্ষার্থীদের কান খোলা রাখতে হবে এবং কান টর্চলাইট দিয়ে চেক করা হবে। এছাড়া সন্দেহ হলে শরীরও তল্লাশি করা হতে পারে। পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন, বই, নোট, কাগজপত্র, ক্যালকুলেটর, ভ্যানিটিব্যাগ, ঘড়িসহ যেকোনো ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেইসেঙ্গ বিকেল ২টা ৪০ মিনিটে পরীক্ষা শুরু হলেও বিকেল ২টা ৩০ মিনিটে কেন্দ্রের সব গেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। এজন্য দুপুর ১টা ৩০ মিনিট থেকে ২টার মধ্যেই সকল প্রার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠু করতে সবধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। ডিবি পুলিশ, সিআইডি, এসবি ও ডিএসবি একসঙ্গে মাঠে নেমেছে। এছাড়া র্যাবের সাইবার টিমও কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে। প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কয়েকটি সেটের প্রশ্ন করা হয়েছে, যা সরবরাহ করা হবে পরীক্ষা শুরুর মাত্র ২০ মিনিট আগে। শুধু জেলায় জেলায় নয়, শিক্ষা অধিদফতর ও বিজি প্রেসেও কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপানোর সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরও নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। আলাদা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিজি প্রেসে।
এদিকে সারাবাংলার রংপুর করেসপন্ডেন্ট রাব্বী হাসান সবুজ জানিয়েছেন, সারাবাংলা ডটনেটে খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই অভিযানে নেমেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) ডিভাইসসহ দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। ১৫-২০ লাখ টাকায় প্রতারকরা চুক্তি করছে চাকরি দেওয়ার জন্য। পুলিশ প্রতারকদের থেকে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের দূরে থাকতে বলেছেন।
এ বিষয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডিভাইস পার্টি ধরতে গতকাল রাতভর অভিযান চালানো হয়েছে। সারাদিন সতর্ক রয়েছে পুলিশ। আজ রাতেও অভিযান অব্যাহত থাকবে। এখনো কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। আগামীকাল পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশের সব ফটোকপি ও কম্পিউটারের দোকান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা দিতে বলা হয়েছে।’
এদিকে ‘২০ লাখ টাকায় পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর ডিভাইসের মাধ্যমে বলে দেওয়া হবে’ এমন চুক্তি করতে গিয়ে রাজশাহীতে ধরা পড়েছেন অন্তত তিন প্রতারক। তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, ডিভাইস ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। অপরদিকে ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইসসহ চার জনকে গ্রেফতার করেছে যশোর জেলা ডিবি পুলিশ। তাদেরও উত্তরপত্র ডিভাইসের মাধ্যমে বলে দেওয়ার কথা ছিল। একইসঙ্গে বৃহস্পতিবার খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে দু’জনকে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক সরোয়ার আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুক্রবার প্রাথমিকের সবচেয়ে বড় নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য সবধরনের প্রস্তুতির পাশাপাশি জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসন প্রশ্নফাঁস এবং ডিভাইস ঠেকাতে কাজ করছে। পরীক্ষার আগের রাতে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। এ বিষয়ে জড়িত কাউকে পাওয়া গেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া, পরীক্ষার্থীদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতারকদের কাছ থেকে সতর্ক থাকার জন্য ক্যাম্পেইন করা হয়েছে।’
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকা জেলায় পরীক্ষার্থী অন্যান্য জেলার চেয়ে অনেক কম। এর পরও ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি ডিভাইস সরবরাহ করা হয়ে থাকে বলে তথ্য রয়েছে। এজন্য ঢাকা জেলা ডিবি পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা মাঠে তৎপর রয়েছেন।’ পরীক্ষাসংক্রান্ত কোনো অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস বা ডিভাইসের সঙ্গে জড়িত যে কাউকে পেলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান ডিআইজি।