রংপুর: উত্তরাঞ্চলে টানা কয়েকদিনের ঘন কুয়াশা এবং তীব্র শীতের কারণে আলুর খেতে ‘লেট ব্লাইট’ বা ‘পাতামড়ক’ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। রোগাক্রান্ত গাছের পাতায় কালচে দাগ, ফোসকা এবং পচন দেখা যাচ্ছে, যা এক রাতেই পুরো ক্ষেত নষ্ট করে দিতে পারে। কৃষকরা বারবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করেও রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছেন না, ফলে খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং ফলন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ কৃষকদের আগাম সতর্কতা জারি করে পরিমিত পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। আর আবহাওয়া অফিস বলছে, এ অবস্থা থাকবে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
ঘন কুয়াশায় লেট ব্লাইটের শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রংপুর অঞ্চলের আলুচাষিরা। মাঠভরা আলু বাঁচাতে চড়া দামে কীটনাশক কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ঘন কুয়াশার সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনো ভরা আলুর মাঠ রক্ষা করে চলেছেন শত শত আলুচাষি। স্বাভাবিকভাবে ‘লেট ব্লাইট’ প্রতিরোধে একবার কীটনাশক স্প্রে করতে হয়, সেখানে প্রতি সপ্তাহে কীটনাশক ছিটিয়েও নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না কৃষকরা। বারবার কীটনাশক কিনতে খরচ বাড়ছে।
রংপুর নগরীর বোতলা এলাকার আলুচাষি আমিনুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, লেট ব্লাইট দেখা দিলে রাতারাতি পুরো খেত পুড়ে যায় এবং সারা বছরের পরিশ্রম বৃথা যায়। তিনি চড়া দামে কীটনাশক কিনে ব্যবহার করছেন, কিন্তু ফলাফল সন্তোষজনক নয়।

আলু গাছে ‘লেট ব্লাইট’-এর আক্রমণ। ছবি: সারাবাংলা
সাহেবগঞ্জের আশরাফ মিয়া সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আগে একবার স্প্রে করলেই চলতো। কিন্তু, এবারের কুয়াশায় প্রতি সপ্তাহে স্প্রে করেও শঙ্কা কাটছে না।’ মাহিগঞ্জের বদরুল ইসলাম পাঁচ একর জমিতে আলু চাষ করেছেন এবং কুয়াশার কারণে সামান্য ক্ষতি দেখা দিয়েছে, তবে বড় ক্ষতি রোধে কীটনাশক ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।
তারাগঞ্জ উপজেলার বিপ্লব হোসেন অপু এক একর জমিতে স্টিক জাতের আলু রোপণ করেছেন। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত ব্যবহারও রোগের বিস্তার ঘটিয়েছে।’ মিঠাপুকুরের আবু বকর এবং পীরগাছার শহিদুল ইসলামও একই দুশ্চিন্তায় আছেন, যেখানে গত বছরের লোকসান এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ১ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর জেলায় ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর, গাইবান্ধায় ১২ হাজার ৫০ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৭ হাজার ১০০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং নীলফামারীতে ২২ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, ‘লেট ব্লাইট’ একটি মারাত্মক ছত্রাকজনিত রোগ, যা নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া এবং গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে দ্রুত ছড়ায়। রোগের লক্ষণ হলো গাছের গোড়ার পাতায় ভেজা সবুজ দাগ, যা কালো হয়ে পচে যায় এবং সকালে সাদা পাউডারের মতো জীবাণু দেখা যায়। সারাদেশে এ রোগের কারণে প্রতি মৌসুমে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।

ঘণ কুয়াশা ও শীতে আলু গাছে ‘লেট ব্লাইট’-এর আক্রমণ। ছবি: সারাবাংলা
তারাগঞ্জ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তামান্না বেগম সারাবাংলাকে জানান, রোদ কম থাকলে পাঁচ দিন পর পর ম্যানকোজেব গ্রুপের ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের ওষুধ পচন রোধে ব্যবহার করতে হবে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘রোগের অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পেলে সাত দিন পরপর অনুমোদিত ছত্রাকনাশক (প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম) স্প্রে করতে হবে। আক্রান্ত হলে সেচ বন্ধ করে চার-পাঁচ দিন পরপর স্প্রে চালিয়ে যেতে হবে।’
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রেকর্ড হয়েছে এবং মাঝারি থেকে ঘনকুয়াশা মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকতে পারে। জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা আলুর রোগের জন্য অনুকূল। ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে।’
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে আলু উৎপাদন রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১ দশমিক ১৫ কোটি টন, যা গত বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। রংপুর জেলাসহ বিভাগের ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুরসহ উত্তরের জেলাগুলো আলুর প্রধান উৎপাদনকারী। বিজ্ঞানীরা ‘লেট ব্লাইট’ রেজিস্ট্যান্ট জাত যেমন সার্পো মিরা এবং জেনেটিকালি মডিফাইড ৩আর-জিন পটেটোর ট্রায়াল চালাচ্ছেন, যা রংপুরে সফলতা দেখিয়েছে।
তবে কৃষি কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম আশাবাদী যে, কৃষকদের পরিশ্রম এবং পরামর্শ মেনে চললে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন ঘটনা বাড়তে পারে।