রংপুর: তারাগঞ্জে গণপিটুনিতে রূপলাল ও প্রদীপ লাল হত্যা মামলার এক আসামি জামিনে বেরিয়ে, মামলা তুলে নিতে বাদীর পরিবারকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা যায়, নিহত রূপলালের স্ত্রী ভারতী রানী (৩৬) সোমবার (২৬ জানুয়ারি) তারাগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
জামিনে মুক্ত আসামি রুবেল পাইকারসহ অন্যরা মামলা প্রত্যাহারের জন্য গালিগালাজ, ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে উল্লেখ করে পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
ভারতী রানী জানান, গত বছরের ৯ আগস্ট রাতে তার স্বামী রূপলাল দাস (৪০) ও জামাতা প্রদীপ লাল (৩৫)কে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তিনি ১০ আগস্ট তারাগঞ্জ থানায় বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা প্রায় ৭০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মো. রুবেল পাইকার (৩০) জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর ২২ জানুয়ারি তারাগঞ্জ বাজারে ভারতী রানী ও তার ছেলে জয় রবিদাসকে দেখে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেন। মামলা প্রত্যাহার না করলে প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া আরেক আসামি সোহাগও বিভিন্ন সময়ে লোকজন দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন।
ভারতী রানী বলেন, ‘ন্যায়বিচারের আশায় মামলা করেছিলাম, কিন্তু এখন আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমার ছেলে বাইরে দোকান করে সংসার চালায়, কিন্তু ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না। ওরা খুব হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। নিরুপায় হয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছি।’
নিহত রূপলালের ছেলে জয় রবিদাস বলেন, ‘বাবাকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিওতে রুবেল পাইকার ও সোহাগকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সোহাগ বুক ফুলিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং লোকজন দিয়ে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরছে না। রুবেল পাইকার জামিনে এসে হুমকি দিচ্ছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। বাবা হত্যার বিচার চাওয়া কি আমাদের অপরাধ?’
উল্লেখ্য, গত বছরের ৯ আগস্ট রাত সাড়ে আটটার দিকে মিঠাপুকুর উপজেলার ছড়ান বালুয়া এলাকা থেকে প্রদীপ লাল ভ্যান নিয়ে তারাগঞ্জের ঘনিরামপুর গ্রামে রূপলালের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথ ভুলে যাওয়ায় রূপলাল তাকে খুঁজতে যান। সয়ার ইউনিয়নের বুড়িরহাট বটতলা মোড়ে পৌঁছালে স্থানীয় কয়েকজন চোর সন্দেহে তাদের গতিরোধ করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রদীপের কাছে থাকা কালো ব্যাগ তল্লাশি করে একটি পানীয়ের বোতল (স্পিড বলে সন্দেহ) ও কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। বোতলের ঢাকনা খোলার পর দুর্গন্ধে কয়েকজন অসুস্থ বোধ করলে উত্তেজিত জনতা কাছের একটি বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে গণপিটুনি দেয়। আহত অবস্থায় তাদের তারাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে রূপলালকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গুরুতর আহত প্রদীপকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে পরদিন ভোরে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশের তদন্তে ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা যায়, মূল পরিকল্পনাকারী মেহেদী হাসান (৩০) ভ্যানের বস্তা থেকে স্পিডের বোতল বের করে নাকের কাছে নিয়ে অচেতন হয়ে যাচ্ছেন বলে চিৎকার করে মবকে উত্তেজিত করেন।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) র্যাবের যৌথ অভিযানে ঢাকার শাহবাগ থেকে মেহেদী হাসানরক গ্রেফতার করা হয়। এর আগে, ১৭ জানুয়ারি ‘আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি’র তারাগঞ্জ উপজেলা সদস্যসচিব ইউনুস আলীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ১২ জন গ্রেফতার হয়েছেন।
তবে রুবেল পাইকার হুমকির অভিযোগকে বানোয়াট বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘মামলায় আসামি ৭০০ জন। আমরা দুজন গিয়ে মামলা তুলে নিতে বলব, এতে আমাদের কী লাভ? এসব সাজানো অভিযোগ, তাকে আমি চিনি না, জীবনেও তার বাড়িতে যাইনি।’
আর সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তারাগঞ্জ থানার ডিউটি অফিসার এসআই প্রদীপ কুমার বর্মণ অভিযোগ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ঘটনা গণপিটুনির বিপদ এবং বিচার প্রক্রিয়ায় সাক্ষী-বাদীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয়রা বলছেন, এমন ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা দরকার।