রংপুর: বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) প্রার্থী হিসেবে রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আনোয়ারা ইসলাম রানী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।
হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের দাবিতে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টায় রংপুর নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

সংবাদ সম্মেলনে রানী বলেন, ‘প্রিয় জন্মভূমির কাছে হিজড়া জনগোষ্ঠীসহ সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের দাবিতে আমি আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছি। কোনো ধরনের চাপ বা ভয়ভীতি নেই। অবহেলিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে এবং বিষয়টি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আনতেই এই সিদ্ধান্ত।’
তিনি বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, সেখানে হিজড়া জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। সেই বৈষম্য দূর করতেই তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান।’
আনোয়ারা ইসলাম রানী রংপুরের স্থানীয় হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন নেত্রী ও সামাজিক কর্মী। স্কুল ড্রপআউট রানী বিউটি পার্লার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং সম্প্রদায়ের সদস্যদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। তিনি এর আগে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রংপুর-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করে আলোচনায় আসেন। সেবার তার প্রতীক ছিল ‘ঈগল’। তখন তিনি হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলে ব্যাপক প্রচারণা চালান।
প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি এসেছে এমন সময়ে যখন বাংলাদেশের নির্বাচনী ল্যান্ডস্কেপে নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, এবারের নির্বাচনে মোট ৭৮ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৩.৫ শতাংশ। রানী ছিলেন একমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী, যা তার লড়াইকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছিল। জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা তার এই পদক্ষেপকে ‘সাহসের প্রতীক’ বলে অভিহিত করেছেন।
রংপুর-৩ আসনের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৯৮ হাজার, যার মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি। রানীর প্রচারণায় তিনি লাঞ্ছনা, বঞ্ছনা এবং বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, প্রতিপক্ষের সমর্থকরা অনলাইন-অফলাইনে বুলিং করছেন, যেমন “হিজড়া প্রার্থীকে ভোট দিলে ধরে ধরে হিজড়া বানানো হবে” বলে প্রচার। এবার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি বলেন, এটি চাপ বা ভয়ের কারণে নয়, বরং বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে আলোচিত করার জন্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সংরক্ষিত আসনের দাবিকে জোরদার করবে এবং নির্বাচনি সংস্কারের আলোচনাকে এগিয়ে নেবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে সংসদে তৃতীয় লিঙ্গের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসন নেই, যা অন্যান্য দেশের মতো ভারত বা নেপালে রয়েছে। রানীর এই অবস্থান সমাজে অন্তর্ভুক্তির লড়াইকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।