কক্সবাজার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কক্সবাজার জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ভোটগ্রহণ কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে ‘জেলা সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টার’ গঠন করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। নির্বাচনকালীন সময়ে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করাই হবে এই কমান্ড সেন্টারের মূল দায়িত্ব।
জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগীয় পর্যায়ের কোর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত এই কমান্ড সেন্টার ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), নৌবাহিনী, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, র্যাব, পুলিশ, ডিজিএফআই, এনএসআই, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী সময়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশনা এই কমান্ড সেন্টার থেকেই দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এখান থেকেই সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হবে।
ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় কক্সবাজার জেলা বরাবরই নির্বাচনি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত। সীমান্তবর্তী এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ এবং অতীতে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার অভিজ্ঞতার কারণে এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে জেলায় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন, টহল জোরদার, তল্লাশি কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জেলার ৫৯৮ কেন্দ্রের ৩২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ:
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ৫৯৮টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৩২৯টিকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ২৬৯টি কেন্দ্র সাধারণ হিসেবে বিবেচিত। আসনভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা হলো- কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া): ১৮০টির মধ্যে ৯৩টি, কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া): ১২৪টির মধ্যে ৫৯টি, কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও): ১৮২টির মধ্যে ১০৯টি এবং কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ): ১১৭টির মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্র।
প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অতীত সংঘর্ষের ইতিহাস, জনবহুল কেন্দ্র, সীমান্ত ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় এসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত টহল ও যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে মোট ৬১টি যৌথ অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং সদস্যসহ মোট ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানে ১৯টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ১০০ রাউন্ড গুলি, ৯৩টি দেশীয় অস্ত্র, একটি ড্রোন, একটি ওয়াকিটকি, ১৩ লাখ টাকার জাল নোট এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা মাদকের মধ্যে রয়েছে ৬ হাজার ২০১টি ইয়াবা, ৫৪১ লিটার দেশীয় মদ, ২৩ লিটার বিয়ার ও ৬ কেজি গাঁজা।
১০ পদাতিক ডিভিশনের লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাইয়াজ মোহাম্মদ আকবর বলেন, যৌথ অভিযানের ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বস্তি ও নিরাপত্তাবোধ ফিরে এসেছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে নিয়মিত টহল ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোতে নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিনসহ উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলগুলোতে নৌবাহিনীর পাশাপাশি কোস্টগার্ড ও অন্যান্য বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।
আইএসপিআর জানায়, ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী দেশের ১৭টি সংসদীয় আসনের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান গত বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজার পরিদর্শন করেন।
এদিকে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কক্সবাজার এলাকা পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গত ২৯ জানুয়ারি তিনি কক্সবাজারের বিয়াম ফাউন্ডেশন আঞ্চলিক কেন্দ্রে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
আইএসপিআর জানায়, সভায় নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দায়িত্ব পালনের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান দায়িত্ব পালনে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। পরিদর্শনকালে তিনি ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ারের আওতায় মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে কেবল বাহিনীর উপস্থিতি নয়, বরং সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই লক্ষ্যেই কমান্ড সেন্টারের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।’
তিনি জানান, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে ৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ৩৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজার জেলায় এখন সব বাহিনীর নজর- নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা এবং ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ বজায় রাখা।