ব্রাহ্মণবাড়িয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল–আশুগঞ্জ–বিজয়নগরের একাংশ) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ত্রিমুখী লড়াইয়ের স্পষ্ট আভাস মিলছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের মহাসচিব তরুণদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ অবস্থায় স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে সমর্থন দিয়েছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে সরাইলে রুমিন ফারহানার নির্বাচনী প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমর্থন ঘোষণা করেন।
এ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। সরাইল উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক মো. সেলিমের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ ভাসানী, সরাইল উপজেলা সদস্য সচিব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিজয়নগর উপজেলা সভাপতি আজিজুর রহমান দুলাল, আশুগঞ্জ উপজেলা সভাপতি আনিস সরকার, সরাইল উপজেলা যুব সংহতি সভাপতি বিল্লাল হোসেন, জাপা নেতা হোসাইন মোহাম্মদ শাওন এবং মহিলা নেত্রী নাজি বেগম। সমাবেশে সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলার জাতীয় পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে অংশ নেন।
এর আগে নির্বাচনি পরিবেশ প্রতিকূল উল্লেখ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
এ আসনে বিএনপির সাবেক (বহিষ্কৃত) দুই নেতা—ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও তরুণ দে—স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খেজুর গাছ প্রতীকে দলীয় সমর্থন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব।
এলাকায় প্রায় ৮০ হাজারের বেশি হিন্দু ভোটার থাকায় সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে সব প্রার্থীই হিন্দু ভোটারদের মন জয়ে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
সরাইল সদর এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘যাত্রীদের সঙ্গে কথাবার্তায় হাঁস প্রতীক নিয়েই বেশি আলোচনা শুনি। শুরুতে খেজুর গাছ নিয়ে কথা কম ছিল, এখন খেজুর গাছ আর কলার ছড়ির প্রচারণাও ভালোই চলছে। এই তিনজনের মধ্য থেকেই একজন জিতবেন।’
স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব ভোটার আব্দুল জব্বার বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপি প্রার্থী জিতেছিল। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। খেজুর গাছের পক্ষে বিএনপির নেতারা কাজ করছেন। তবে রুমিন ফারহানা ও তরুণ দে-দুজনই সাবেক বিএনপি নেতা হওয়ায় ভোট ভাগ হতে পারে। হিন্দু ভোট বড় ফ্যাক্টর হওয়ায় তরুণ দে এখন আলোচনায় উঠে এসেছেন।’
রোববার সরাইল উপজেলায় প্রচারণাকালে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনিছুল ইসলাম ঠাকুর বলেন,‘দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় ভোট কিছুটা কাটবে। তবে এতে জয়ের পথে বড় কোনো বাধা হবে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান খেজুর গাছের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। খেজুর গাছই আমাদের কাছে ধানের শীষ।’
স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই। দল যদি মনে করে আমার আর প্রয়োজন নেই, সেটি আমি মেনে নিয়েছি। আমি আমার মতো করেই রাজনীতি চালিয়ে যাব।’
এর আগে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আমরা হাঁস, আমরা চাষ করা ধানই খাবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে অতীতে বিএনপি ছয়বার, জাতীয় পার্টি তিনবার এবং একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে খেজুর গাছ, কলার ছড়ি ও হাঁস প্রতীকের বাইরে জেএসডির তৈমুর রেজা মো. শাহজাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেছার আহমাদ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মো. মাঈন উদ্দিন এবং আমজনতা দলের শরিফা আক্তারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সব মিলিয়ে ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোটব্যাংকের বিভাজন এবং সংখ্যালঘু ভোটের গুরুত্ব-এই তিন কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে এবারের নির্বাচন যে হাড্ডাহাড্ডি হতে যাচ্ছে, তা বলাই যায়।