রংপুর: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রংপুর জেলায় ৬ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়েছে পুলিশ। জেলার ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় যৌথবাহিনীর বিশেষ মহড়া সম্পন্ন হয়েছে, এতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব এবং আনসারের সমন্বয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিভাগে মোট ৪ হাজার ৫৪৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ২ হাজার ৫৬১টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮২৭টি অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফাত হুসাইন পুলিশ লাইন্সে নির্বাচনি ব্রিফিং প্যারেড শেষে সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ রাখতে জেলা পুলিশের আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব-সেক্টর এবং সেক্টর ভাগ করে ভোটার, প্রার্থী এবং নির্বাচনী সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে, যা লাইভ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

এসপি আরও জানান, নির্বাচনি মাঠে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব এবং আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। রংপুর জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। যার মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন, পুরুষ ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩১ জন। ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ হবে, যেখানে ৪৪ জন প্রার্থী (রাজনৈতিক দলীয় ও স্বতন্ত্র) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেলার নির্বাচনি পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যেতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২১টি এবং ৮ উপজেলায় ৯৫টি কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে- ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়া, অতীতে অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের ঘটনা, সীমানা প্রাচীরের অভাব, প্রার্থী বা নেতাদের বাড়ি সংলগ্ন হওয়া, দূরবর্তী বা জনবহুল এলাকা ইত্যাদি বিবেচনায়। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং তল্লাশি ও নজরদারির জন্য ডগ স্কোয়াড (কুকুর দল) চালু রাখা হয়েছে।
এদিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি) কমিশনার মজিদ আলী এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের ৩টি আসনের আংশিক অংশে তাদের দায়িত্ব রয়েছে, যেখানে ২০৪টি কেন্দ্রে নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এছাড়া ৩০টি মোবাইল পেট্রোল টিম এবং ৭৮টি স্ট্রাইকিং রিজার্ভ ফোর্স কাজ করবে।
পুলিশ কমিশনার মজিদ আলীও নিরাপত্তা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকায় বিশৃঙ্খলা ঘটলে তারা হেলিকপ্টার ড্রপ করে দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে।
বিজিবির রংপুর সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম শফিকুর রহমান জানান, বিভাগের ৪ জেলায় (রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা) ৩ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি মোবাইল, স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং চেকপোস্টের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বিভাগে মোট ২ হাজার ৫৭২টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬০০টি ঝুঁকিপূর্ণ।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান জানান, বিভাগে মোট ভোটার সংখ্যা ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ জন। চরাঞ্চল, যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকা এবং প্রার্থীদের বাড়ি সংলগ্ন কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। অতীতে ভোটকেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ বা ভয়ভীতির অভিযোগ থাকায় এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত অস্ত্রধারী পুলিশ, আনসার সদস্য, ভিজিলেন্স টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে, নির্বাচনি প্রস্তুতি শেষ হয়েছে এবং ব্যালট পেপার সব আসনে পৌঁছে গেছে।
এদিকে, আনসার বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত সদস্যদেরই ডিউটিতে নিয়োজিত করা হয়েছে।