Saturday 17 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ওপারে বন্দি শুক্কুর, এপারে শুকিয়ে যাচ্ছে সাজেদার চোখের জল

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:২৬
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কক্সবাজার: টেকনাফ জেটিঘাটে তখন মানুষের ঢল। স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আনন্দে কেউ কাঁদছেন, কেউ হাসছেন, কেউ মোবাইল ফোনে খবর দিচ্ছেন বাড়িতে। সেই ভিড়ের মাঝেই এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাজেদা বেগম (৩২)। চোখে অনিদ্রার ছাপ, মুখে উৎকণ্ঠা। বারবার নদীর দিকে তাকাচ্ছিলেন। যদি ঘাটে ফেরা জেলেদের ভিড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ বেরিয়ে আসেন তার স্বামী আব্দু শুক্কুর (৪০)। কিন্তু না, ফেরত আসা ৭৩ জন জেলের ভিড়ে শুক্কুরকে খুঁজে পাওয়া গেল না। মুহূর্তেই ভেঙে পড়লেন সাজেদা। তার আহাজারিতে কেঁপে উঠল ঘাটের পরিবেশ।

গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি মাছ ধরতে গেলে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশ থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। পরে তাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আটকে রাখা হয়। একইসঙ্গে ধরে নেওয়া হয় তার মামাতো ভাই মোস্তাফা কামালকেও।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ৭৩ জন জেলেকে শূন্যরেখায় হস্তান্তর করা হলো। তাদের গ্রহণ করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিনিধিদল টেকনাফের জালিয়াপাড়া ঘাট থেকে নাফ নদীর দিকে যায়। বিকেলের দিকে যখন একে একে ক্লান্ত, অবসন্ন মুখগুলো ঘাটে নামছিল, সাজেদা প্রতিটি মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এই বুঝি শুক্কুর! কিন্তু না। ৭৩ জনের কেউই শুক্কুর নন।

স্বামীকে না পেয়ে সাজেদা হঠাৎ মাটিতে বসে পড়েন। বুক চাপড়ে কান্না করতে করতে বলেন, ‘ও কি আর ফিরবে না? বাচ্চাদের কী বলব?’ তার কান্নায় ভেঙে পড়েন আশপাশের স্বজনরাও। কেউ তাকে ধরে রাখেন, কেউ পানি দেন। কিন্তু যে শূন্যতা, তা কি ভরাট হয় ?

শুক্কুরের চার সন্তান। দুই ছেলে, দুই মেয়ে। বড়টি মাত্র ১০ বছর বয়সী। ছোটটি এখনো মায়ের কোল ছাড়েনি। স্বামী আটক হওয়ার পর সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে সাজেদাকেই। স্থানীয় একটি ইটভাটায় রান্নার কাজ করে কোনোমতে দিন চলে। অনেক দিন শুধু লবণ-ভাত খেয়েও কাটাতে হয়েছে। সাজেদা বলেন, ‘ও থাকলে কষ্ট হলেও সাহস ছিল। এখন শুধু ভয়।’

এ সময় ঘাটে নামা প্রত্যেক জেলের কাছে ছুটে যান সাজেদা। কারও হাত ধরে জিজ্ঞেস করেন, ‘শুক্কুরের খবর জানেন?’ কেউ বলেন, ‘ও অন্য ক্যাম্পে থাকতে পারে।’ কেউ বলেন, ‘আমরা দেখিনি।’ এই ‘দেখিনি’ শব্দটাই যেন তার বুক ভেঙে দেয়।

বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, বিভিন্ন সময়ে ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের মধ্যে ৭৩ জনকে ফেরত দিয়েছে আরাকান আর্মি। তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাই ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু সাজেদার জন্য এই ঘোষণায় নেই কোনো সান্ত্বনা।

টেকনাফের জেলে পল্লিতে সোমবার উৎসবের আবহ। অনেক বাড়িতে রান্না হয়েছে বিশেষ খাবার। দীর্ঘ একবছর পর বাবা ফিরেছেন, স্বামী ফিরেছেন। এই আনন্দে ভরে উঠেছে ঘর। কিন্তু সাজেদাদের ঘরে এখনো চুলা জ্বলে উদ্বেগে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, গত কয়েক মাসে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে অন্তত ২০০ জেলেকে আটক করে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। আলোচনা চলছে, প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু কবে ফিরবেন সবাই, তার নিশ্চয়তা নেই।

বিজিবি জানিয়েছে, এখনো যারা আটক রয়েছেন, তাদের দ্রুত ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও মানবিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তবর্তী নদী ও সাগরে মাছ ধরার সময় আন্তর্জাতিক জলসীমা সম্পর্কে জেলেদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

সন্ধ্যা নামার সময়ও ঘাট ছাড়েননি সাজেদা। নাফ নদীর কালচে জলে তাকিয়ে ছিলেন স্থির দৃষ্টিতে। যেন নদীর ঢেউ ভেদ করে একদিন ভেসে উঠবে পরিচিত মুখটি। ‘ও বেঁচে থাকলে ফিরবেই।’ নিজেকেই বোঝানোর মতো করে বলেন তিনি।

সীমান্তের এই নদী বহুবার কেড়ে নিয়েছে স্বপ্ন, আবার ফিরিয়েও দিয়েছে প্রিয়জনকে। সোমবার ৭৩ জন ফিরেছেন। কিন্তু সাজেদার মতো কত পরিবার এখনো অপেক্ষায়, তার হিসাব কেউ রাখে না। নাফের ওপারের অন্ধকারে হয়তো এখনো বন্দি শুক্কুর। আর এপারে টেকনাফ ঘাটে, তার জন্য প্রতিদিন একটু একটু করে শুকিয়ে যাচ্ছে এক নারীর চোখের জল।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো