রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সদ্য চাকরিচ্যুত রেজিস্ট্রার ড. মো. হারুন-অর-রশিদ অভিযোগ করেছেন, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ঢাকতেই তাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশ ছিল ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত যেসব অনিয়ম হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। আমি রেজিস্ট্রার হিসেবে এসব তদন্ত করছিলাম বলেই শত্রুতে পরিণত হয়েছি। তাই চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’
তিনি বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, ‘রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি নিয়োগ বাণিজ্য, জাল সনদে চাকরি, ভর্তি পরীক্ষার অর্থ ভাগাভাগি এবং শহিদ আবু সাঈদ হত্যা মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার তথ্য সামনে আনেন।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ, তিনি ইন্টার মিডিয়েট পরীক্ষায় ২ দশমিক ৯০ পেয়েছেন। সেই রেজাল্টকে তিনি ঘষামাজা করে ৩ দশমিক ১০ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ড তাকে নিয়োগ দিতে চায়নি। পরে তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে হাইকোর্টে রিট করে চাকরি পেয়েছেন। আমি রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডে মোহাম্মদ ইউসুফের ইন্টার মিডিয়েটের রেজাল্ট যাচাইয়ের জন্য পাঠিয়েছিলাম। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেছেন, তার রেজাল্ট জাল অর্থাৎ মোহাম্মদ ইউসুফ রেজাল্ট টেম্পারিং করেছেন। আমি কেনো বোর্ডে খোঁজ নিলাম এটা আমার অপরাধ।’
তার জীবনের বীভৎস অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাবিউর রহমান প্রধানের নিয়োগ হয়েছিল অনিয়ম করে। তার নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত একটা দীর্ঘ উপন্যাস। দুর্ভাগ্যক্রমে হোক কিংবা সৌভাগ্যক্রমে হোক তার এই নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত কমিটিতে আমি রেজিস্ট্রার হিসেবে সদস্য ছিলাম। আমি আশ্চর্য হয়েছি, শিক্ষিত মানুষরা কত নীচে নামতে পারে। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক কলিমউল্লাহ তাকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য যারপরনাই দুর্নীতি করেছেন। ভিসি তাকে পদোন্নতি দিতে ডিন এবং বিভাগের প্রধান হয়েছেন অর্থাৎ এক ব্যক্তি ভিসি, ডীন, বিভাগীয় প্রধান হিসেবে স্বাক্ষর করে পদোন্নতি দিয়ে পরদিন বিশেষ সিন্ডিকেট করে সহযোগী অধ্যাপক বানিয়েছেন। আমার জীবনে দুর্নীতির এত বীভৎস কোনোদিন দেখিনি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমি এই তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলাম এটা আমার অপরাধ।’
ড. হারুন-অর-রশিদ আরও বলেন, ‘২৪ জানুয়ারি উপাচার্যের বাসভবনে ছাত্রদল, বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও বহিরাগতদের সভায় তাকে সরানোর পরিকল্পনা হয়। ২৫ জানুয়ারি ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আমাকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অব্যাহতি দেওয়া হয়।’
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘শহিদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বাদী হিসেবে মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়েছিলাম। আমার অব্যাহতির ফলে এই মামলা ধামাচাপা পড়তে পারে। জুলাই আন্দোলনের সময় আবু সাঈদসহ শিক্ষার্থীদের উপর যেসব শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারি হেলমেট পড়ে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেছেন, তাঁদের ফুটেজ আছে, প্রমাণ আছে তাদের মামলা থেকে বাদ দিতে বর্তমান প্রশাসনের অনেকে চাপ প্রয়োগ করেছেন যেনো মামলাটি হালকা হয়ে যায়।’
কয়েকটি দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার অনুরোধ- বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ, শিক্ষক সমিতি ও কর্মকর্তা-কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম চালু করা, দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করা, নিয়োগ-পদোন্নতিতে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করা এবং উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করা যেন হয়।’
গত ২৫ জানুয়ারি ছাত্রদল ও শিবির সমর্থিত শিক্ষার্থীরা পালটাপালটি সংবাদ সম্মেলন করে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। শিবির উপাচার্যকে ‘বিএনপিপন্থী ও চক্রান্তকারী’ বলে অভিহিত করে চাকরিচ্যুতির দাবি তোলে, আর ছাত্রদল উপাচার্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ, জামায়াতপন্থী ও গুপ্ত গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তোলে। জামায়াতের রাজনীতি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের রাজনীতি করার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’
তবে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আনোয়ারুল হক কাজলকে পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। এ প্রসঙ্গে ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘আমি একজন নাগরিক হিসেবে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করছি।’
উল্লেখ্য, ড. মো. হারুন-অর রশিদকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর পরে। তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ১১৬তম সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিসেম্বরে আবার পরবর্তী এক বছরের চুক্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক ও কর্মকর্তা জাল সনদ ও মিথ্যা অভিজ্ঞতার তথ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে চাকরি করে আসছেন। এই দুর্নীতির কারণে অনেক জনকে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক এবং কর্মকর্তা তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে জানা গেছে।
এরমধ্যে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২০তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় ড. হারুন-অর-রশিদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে উপাচার্য।
এই সংবাদ সম্মেলন বেরোবির সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সংকট ও রাজনৈতিক উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছেন, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রয়াস, আবার অন্যরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বলে দেখছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।