Friday 27 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মালয়েশিয়ায় নির্যাতনে মৃত্যু, এক মাস পর কফিনবন্দী হয়ে ফিরলেন কাজল

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৪৬

কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

কক্সবাজার: কফিনবন্দী নিথর দেহটি যখন বাড়ির উঠানে নামানো হলো, কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠল চারপাশ। এক মাস আগে মালয়েশিয়ায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল্লাহ কাজল অবশেষে ফিরলেন নিজের বাড়ি কক্সবাজারের রামু উপজেলার পেঁচার দ্বীপে। কিন্তু জীবিকার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া সেই তরুণ ফিরলেন লাশ হয়ে।

শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ভোরে মরদেহ কক্সবাজারে পৌঁছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, দুই মাস আগে জীবিকার আশায় মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বাড়ি ছাড়েন কাজল। তার সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও দুই তরুণ ফারুক ও জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক দালাল শফির প্রলোভনে তারা বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্রুত কাজ ও ভালো আয়ের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাদের।

বিজ্ঞাপন

স্বজনদের দাবি, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়। সেখানে একটি চক্র তাদের আটকে রেখে প্রত্যেকের পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করে। ফোনে নির্যাতনের বর্ণনা শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

কাজলের বড় ভাই বলেন, ‘ও ফোনে কাঁদত। বলত, টাকা না দিতে পারায় মারছে। আমরা যা পারছি করছি।’ পরিবার ও এলাকাবাসী চাঁদা তুলে, গবাদিপশু বিক্রি করে এবং জমি বন্ধক রেখে চার লাখ ২০ হাজার টাকা জোগাড় করেন। অভিযোগ, সেই টাকা দালাল শফির হাতে তুলে দেওয়া হলেও তিনি তা নির্যাতনকারীদের কাছে পাঠাননি। বরং আত্মসাৎ করেন। টাকা না পৌঁছানোয় নির্যাতনের মাত্রা বাড়ে। একপর্যায়ে মারধরের আঘাতে মারা যান আব্দুল্লাহ কাজল।

তিনি জানান, প্রায় এক মাস আগে তার মৃত্যুর খবর আসে গ্রামে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে মরদেহ পৌঁছায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে শুক্রবার ভোরে লাশ নেওয়া হয় কক্সবাজারে। দুপুরের পর পেঁচার দ্বীপে পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। মায়ের আহাজারিতে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ার দৃশ্য হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে।

একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবারটি। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে কাজলের ব্যবহৃত জামা আর পুরোনো একটি মোবাইল ফোন। যেখান থেকে শেষবার শোনা গিয়েছিল তার অসহায় আকুতি, ‘ভাই, আমাকে বাঁচাও।’

এ ঘটনায় তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মানবপাচার ও মৃত্যুর অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

জানা গেছে, কাজলের দুই সহযাত্রীর একজন এখনো মালয়েশিয়ার কারাগারে রয়েছেন। অপরজন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে দেশে ফেরার প্রক্রিয়ায় আছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় সক্রিয় মানবপাচার চক্র দীর্ঘদিন ধরে বেকার তরুণদের টার্গেট করছে। দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকটকে পুঁজি করে স্বল্প সময়ে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই পড়ছেন জিম্মি ও নির্যাতনের ফাঁদে।

পেঁচার দ্বীপের বাসিন্দা মো. আশেক বলেন, ‘কাজলের মতো আর কোনো মা যেন সন্তান হারায় না। দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

মানবাধিকারকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু দালাল গ্রেফতার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক রুটে সক্রিয় পাচার চক্র ভেঙে দিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় কঠোর নজরদারি না বাড়ালে এমন মৃত্যু থামানো কঠিন।

সারাবাংলা/এইচআই
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর