রংপুর: ডিজেলের তীব্র সংকটে উত্তরাঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ কমেছে ৪০ শতাংশ, আর পণ্যবাহী ট্রাকের ৮০ শতাংশ। ফলে, রংপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের ৩০ হাজার কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১০ হাজার কাজে আছেন—বাকি ২০ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। ঈদুল ফিতরের পরে যখন পরিবারের মুখে হাসি থাকার কথা, সেখানে অনেক চালক-হেলপারের ঘরে এখন শুধু হতাশা আর অনিশ্চয়তার কান্না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুরের কামারপাড়া ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে একসময়ের ব্যস্ততা এখন শূন্যতায় পরিণত হয়েছে। যেসব বাস চলছে, সেগুলোও জ্বালানির অভাবে অর্ধেক ট্রিপ কমিয়ে দিয়েছে। পণ্যবাহী ট্রাক তো প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। রংপুর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশিক হোসেন আশিক হৃদয়বিদারক কণ্ঠে বলেন, “ঈদের আগে ৮০ শতাংশ ট্রাক সারাদেশে চলতো। ঈদের পর থেকে শতভাগ ট্রাক চলাচল বন্ধ। আমাদের শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসেছে, পরিবারগুলো না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।”
রংপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান বাবু চোখের জলে বলেন, “৩০ হাজার কর্মচারীর মধ্যে ২০ হাজার এখন বেকার। অনেকের বাড়িতে ছোট ছোট বাচ্চারা খাবার চেয়ে কাঁদছে। ঈদের কেনাকাটা তো দূরের কথা, দু’বেলা ভাত জোটানোই কষ্ট। আমরা শ্রমিকরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি, কিন্তু কাজ নেই।”

পাম্প মালিকরা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। রংপুর পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ শোভন বলেন, “টানা কয়েকদিন ধরে ডিপো থেকে চাহিদার অনেক কম তেল আসছে। ফলে গ্রাহকদের চাপ সামলাতে আমরা বাধ্য হয়ে সীমিত বিক্রি করছি। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি।”
শুক্রবার (২৭ মার্চ) জেলার সব ফিলিং স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ ছিল। শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে মডার্ন মোড়ের একটি পাম্পে মোটরসাইকেল প্রতি ২০০ টাকার পেট্রোল-অকটেন দেওয়া হলেও দুপুরের আগেই মজুত শেষ। রহমান পেট্রোল পাম্পে এক লরি তেল এলে শত শত যানবাহন লাইন ধরে অপেক্ষা করে, কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সব শেষ। গুপ্তপাড়ার সালেক পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার সালাহ উদ্দিন জানান, “ডিপো থেকে বলা হয়েছে ১ এপ্রিলের আগে আর তেল পাব না। ৬ হাজার লিটারের জায়গায় মাত্র ৩ হাজার লিটার এসেছে। গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো অসম্ভব।”
রংপুর মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিমুল বারী রাজ বলেন, “যারা নিয়মিত এই পাম্পে তেল নিতেন, শুধু তাদেরকেই দেওয়া হচ্ছে। নতুন গাড়িগুলো এক ফোঁটা তেলও পাচ্ছে না।”
বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের কাছে যে বরাদ্দ আসছে, তা সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ক্যাবিনেট থেকে জানানো হয়েছে, এক মাসের মজুত আছে এবং পাইপলাইনে তেল আসছে। সবাই সচেতন হলে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।”

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন জোরদার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত চালাচ্ছে। যমুনা পেট্রোলিয়ামের রংপুর অঞ্চলের সেলস অফিসার মোহসিন আলী জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রংপুরের পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে—মজুত অপচয় ও সিন্ডিকেট রোধে। তবু মাঠপর্যায়ে সংকট অব্যাহত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট শুধু চালক-মালিকদের নয়, সাধারণ মানুষের জীবনও ছিন্নভিন্ন করছে। ঈদের ছুটিতে ঘরে ফেরা মানুষেরা রাস্তায় আটকে আছেন, ব্যবসায়ীরা পণ্য পৌঁছাতে পারছেন না। হাজার হাজার শ্রমিকের পরিবার যখন না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাই দ্রুত জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়িয়ে যেন এই হৃদয়বিদারক দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মেলে, অন্যথায় ঈদের আনন্দের বদলে রংপুরের রাস্তায় শুধু হতাশার ছায়া ঘনিয়ে উঠবে।