রাজবাড়ী: পদ্মায় মর্মান্তিক বাস ডুবির ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হলেও বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। নির্দেশনা থাকলেও যাত্রী নামানো ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে উঠছে বাসচালকরা। অন্যদিকে যাত্রীদের উদাসীনতাও পরিবর্তন না আসার অন্যতম কারণ। ফলে ফের ঘটতে পারে ধরনের দুর্ঘটনা।
গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় ফেরিতে ওঠার সময় ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এতে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। ঈদুল ফিতরের যাত্রা শেষে ফেরার সময় ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা সারাদেশে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ পরিদর্শনে এসে নির্দেশ দেন, ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীবাহী বাস থেকে সব যাত্রী নামিয়ে দিতে হবে, শুধু চালক গাড়ি নিয়ে উঠবেন। কিন্তু সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। চালক-যাত্রী কেউ দায়িত্বে থাকা নৌ পুলিশের কথা মানছেন না।
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরি ঘাট এলাকাতে ঘুরে দেখা যায়, ফেরিতে উঠার জন্য বেশ কিছু যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক অপেক্ষা করছে, কিছু যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক সরাসরি ফেরিতে উঠেছে। সেখানে দায়িত্বে থাকা নৌ পুলিশের সদস্যরা বারবার যাত্রীদের নামতে বললেও অনেকেই তা উপেক্ষা করছেন।
বাস চালকরা বলছেন, আমরা যাত্রীদের ফেরিতে নামতে বললেও তারা বাস থেকে নামে না। অন্যদিকে ফেরিতে নামা যাত্রীরা বলছেন, বাসচালক আমাদেরকে কিছুই বলে নাই, আমরা আমাদের জীবনে নিরাপত্তার জন্য নিজ থেকেই নেমে এসেছি।
রহিম নামের এক যাত্রী পরিবারসহ যাচ্ছিলেন ঢাকাতে। তিনি জানান, বাস থেকে কিছুই আমাদেরকে বলেনি। আমি নিজেই পরিবারের সকলকে নিয়ে জীবনের নিরাপত্তার জন্য নেমে এসেছি। প্রত্যেকটা যাত্রীদের নিজ উদ্যোগে এভাবে নেমে ফেরিতে উঠা উচিত।
ইয়াসমিন নামের এক যাত্রী বলেন, ‘বাস থেকে নেমে যেতে বলেছে? কয়েকজন নেমেছি আমরা। অধিকাংশ যাত্রী বাসের মধ্যেই রয়েছে। আমাদের নিজেদেরও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। একটি ড্রাইভারের ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কন্ডাক্টরের ভুলের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আবার অনেক সময় নতুন নতুন হেলপার গাড়ি চালানোর আগ্রহ করে। তাদের হাতে অনেক সময় চালক গাড়ি ছেড়ে দেয় ড্রাইভার। এ কারণেই এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। আমরা চাই না আমাদের ভুলের জন্য একটা বিপদ হোক। এজন্য আমরা গাড়ি থেকে নেমে এসেছি।’’
রাজধানী এক্সপ্রেসের চালক রাসেলসহ বেশ কয়েকজন চালক বলেন, ‘যাত্রীদের কয়েকবার নামার জন্য বলেছি। কেউ নেমেছে আবার অনেকে বসেই আছে। বাচ্চা, ছেলে, মেয়ে নিয়ে এই গরমে কেউ নামতে চাই না। তাদের বলেছি ফেরি থেকে বাসে উঠবেন। কিন্তু কেউ কথা শোনে না।’
এই চালক অভিযোগ করে বলেন, রাস্তা ঢালু থাকার কারণে ফেরিতে নামা ওঠার সময় অনেক প্রেসার পরে গাড়িতে। নামার সময় ঢালুতে নামতে হয়। যদি গাড়িতে ব্রেকে কাজ না করে তাহলে তখনই হবে বিপদ। যেমন সেদিন ঘটে গেল। আমরাও চায় না এমন ঘটনা আর ঘটুক।
তিনি দাবি জানান, প্লাটুনের ব্যারিকেড গুলো উঁচু করে দিক। সঙ্গে ডানে-বাঁয়ে কোনো সমস্যা হলে ব্যারিকেডে আটকে রাখে। রাস্তাটা একটু উঁচু করে দিলে এতটা ঢালু হবে না। চলাচলে সবার জন্যই ভালো হবে।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটের ওপরে অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় সৌহার্দ্য পরিবহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুনের ওপর দিয়ে যাত্রীসহ নদীতে পড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর আমরা তাৎক্ষণিক ফায়ার সার্ভিস, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি, জেলা প্রশাসন উদ্ধার কাজ শুরু করি। গভীর রাতে বাসটি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে বাসটি উদ্ধার করে র্যাকারের সহযোগিতায় নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সামনে রাখা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের দুটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। আমি তদন্ত কমিটির সহযোগিতা করছি এবং কমিটির কছে আমার বক্তব্য দিয়েছি প্রয়োজনে আরও দেব।
গত ২৫ মার্চ বিকেল ৫ টার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস দৌলতদিয়ার তিন নম্বর ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে ডুবে যায়। এ ঘটনায় কয়েকজন সাঁতরে ও স্থানীয়দের সহযোগীতায় তীরে উঠলেও বেশিরভাগ যাত্রীই ডুবে যায়। দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা পর ডুবে যাওয়া বাসটি নদী থেকে টেনে তোলে উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। চালক আরমানের মরদেহসহ একে একে ২৬টি মরদেহ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনার দিন থেকেই ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি, কোস্টগার্ড, নেভি উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের উপ সহকারী পরিচালক দেওয়ান সোহেল রানা বলেন, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উদ্ধার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। কারোর কোনো নিখোঁজের দাবি না থাকায় এই উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করা হয়েছে। বাস ডুবির ঘটনায় মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাথী দাস বলেন, নিরবচ্ছিন্ন অনুসন্ধান চালিয়েও আর কোনো নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে পরিচালিত এই উদ্ধার অভিযান ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হবে বলেও জানান ইউএনও।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ বলেন, আমরা চাই না ভবিষ্যতে আর এ ধরনের ঘটনা ঘটুক। আমি আমার স্টাফের বলেছি- এখন থেকে ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে যাত্রীদের নামাতে হবে। এরপর শুধু চালক গাড়ি নিয়ে ফেরিতে ওঠবে। যাত্রীরা হেঁটে ফেরিতে উঠবে। ফেরি ঘাটে সকল প্লাটুনে নতুন করে রেলিং সংযোজন করা হবে। ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।